সুলতান রাজিয়ার সিংহাসন আরোহনের গুরুত্ব বা তাৎপর্য আলোচনা কর।

 রাজিয়ার সিংহাসন আরোহনের গুরুত্ব 


ইলতুতমিশের জীবদ্দশাতেই তাঁর জ্যেষ্ঠ্য পুত্র নাসিরুদ্দিনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর উত্তরাধীকারীদের মধ্যে সকলেই শাসন পরিচালনায় অযোগ্য হওয়ায় ইলতুতমিশ তাঁর কন্যা রাজিয়াকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীনী মনোনীত করেন ও আমীর ওমরাহদের দ্বারা তা অনুমোদন করিয়ে নেন‌। ইলতুতমিশের ব্যক্তিত্বের কাছে নত হয়ে আমীর ওমরাহরা সেই সময় রাজিয়াকে অনুমোদন করলেও মানসিক ভাবে একজন নারীকে ভবিষ্যৎ সুলতান হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তাই ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর তারা রুকনুদ্দিনকে সিংহাসনে বসান। কিন্তু অযোগ্য এই সুলতানের আমলে সাম্রাজের অভ্যন্তরের নানা জায়গায় বিদ্রোহ দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহের সুযোগে দিল্লির জনগন ও আমীর অমরাহদের একাংশের সমর্থন নিয়ে ১২৩৬ খ্রীস্টাব্দে রাজিয়া সুলতান দিল্লির সিংহাসনে ‌বসেন।

সমসাময়িক পরিস্থিতিতে রাজিয়ার সিংহাসন লাভ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

  • প্রথমতঃ রাজিয়ায় দিল্লির প্রথম সুলতান, যিনি আমির উমরাহ ও জনগণের সমর্থন নিয়ে সিংহাসনে বসেন। আমীর ওমরাহর কর্তৃক তার এই মনোনয়ন সুলতানের দৈব সত্ব রাজ্যাধীকার তত্ত্বের বিলোপ সাধন ঘটায়।
  • দ্বিতীয়তঃ সিংহাসনে নারীর বসার কোন অধিকার নেই - গোড়া উলেমাদের এই বক্তব্য ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়।
  • তৃতীয়তঃ আমীর ওমরাহ ও জনগনের কর্তিক রাজিয়ার এই মনোনয়নের মধ্যে দিয়ে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রশ্নে উলেমাদের হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি তিনি নস্যাৎ করে দেন।
  • চতুর্থতঃ তিনিই প্রথম দিল্লির আমীর ওমরাহদের প্রভাব খর্ব করে রাজতন্ত্রের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করেন।
  • পঞ্চমতঃ তিনি তুর্কী অভিজাতদের সিংহাসন চুত্য করে অতুর্কীদের উচ্চপদে নিয়োগ করে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটান।
  • ষষ্ঠতঃ একজন নারী সুলতান হয়েও তিনি চল্লিশচক্রের ক্ষমতা খর্ব করতে উদ্যোগী হন।

পরিশেষে বলা যায় বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসনকর্তারা দিল্লির কর্তৃত্ব দখলে আগ্রহী ছিল। তাই তারা রাজিয়ার সিংহাসন আরোহণের বিরোধীতা করে। রাজিয়া ছিলেন মধ্যযুগের ভারত ইতিহাসের প্রথম নারী শাসিকা, যিনি অভিজাতদের প্রভাব মুক্ত হয়ে শাসন পরিচালনা করার মতো দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক শ্রীবাস্তব বলছেন, "She was the first Turkish ruler of Delhi to have imposed the royal will upon the Imir's and Malik's."

Related Short Question:

১। ইলতুৎমিসের পর কে দিল্লির সিংহাসনে বসেন?

ইলতুৎমিস রাজিয়াকে সিংহাসনে উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনীত করলেও দিল্লির আমীর ওমরাহরা তার পুত্র রুকনন্দিন ফিরোজশাহকে দিল্লির সিংহাসনে বসান। কিন্তু রুকনদ্দিন এর অপদার্থতা ও অকর্মণ্যতায় শিল্পীর আমীর ওমরাহরা তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজিয়াকে সিংহাসনে বসান।

2। রাজিয়ার সিংহাসনরোহনের গুরুত্ব কী?

রাজিয়ার সিংহাসনারোহনের গুরুত্ব হল- 

  • (১) 'তিনি প্রথম মহিলা সুলতান, যিনি দিল্লীর সিংহাসনে বসেন।
  • ২) তিনিই প্রথম দিল্লীর আমীর-ওমরাহদের প্রভাব খর্ব করে রাজতন্ত্রের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করেন। 
  • ৩) অতুর্কীদের উচ্চপদে নিয়োগ করে তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ দেখান।

৩। নায়েব-ই-লস্কর পদটি কে চালু করেন?

নায়েব-ই-লস্কর পদটি চালু করেন সুলতান রাজিয়া।

৪। রাজিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ও দ্বিতীয় বিদ্রোহ কে করেন?

রাজিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেন লাহোরের ইকতাদার কবির খান, যাকে বলা হয় হাজার মর্দা। দ্বিতীয় বিদ্রোহ করেন ভাতিন্ডার সুবেদার আলতুনিয়া।

৫। আলতুনিয়া কে ছিলেন?

তুর্কী গোষ্ঠীর নেতা ও ভাতিণ্ডার শাসক ছিলেন আলতুনিয়া। তিনি তুর্কী আমিরদের ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। উপায় না পেয়ে রাজিয়া তাকে বিবাহ করেন এবং উচ্চপদ প্রদান করেন।

৬। রাজিয়ার ব্যর্থতার কারণগুলি লেখ?

তাঁর ব্যর্থতার কারণগুলি হল—

  • ১) তাঁর অবগুণ্ঠন ত্যাগ করে পুরুষ পোশাকে দরবারে উপস্থিতি আমীররা মেনে নিতে পারেন নি।
  • ২) নারী শাসিকা হওয়ায় মধ্যযুগীয় পুরুষ শাসিত সমাজ তাঁকে মেনে নিতে পারেনি। 
  • ৩) অ-তুর্কীদের উচ্চপদে নিয়োগ করলে তুর্কী আমিররা তাঁর বিরুদ্ধে করেন। 
  • ৪) তিনি আমীর-ওমরাহদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলে, তারা ক্ষুব্ধ হয়।

Next Post Previous Post