ভারতে বিজয়নগর সাম্রাজের উৎপত্তি, গুরুত্ব ও সংক্ষেপ্ত প্রশ্ন উত্তর

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের উৎপত্তি

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ মনে করেন সঙ্গম নামে এক ব্যক্তির পাঁচ পুত্র তুঙ্গভদ্রা নদীর দক্ষিণ তীরে বিজয়নগর রাজ্যের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই পাঁচ ভ্রাতার মধ্যে হরিহর ও বুক্কার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কথিত আছে, মাধব বিদ্যারত্ন ও তাঁর ভ্রাতা সায়ান নামে দুজন সন্ন্যাসী হরিহর ও বুক্কাকে রাজ্যস্থাপনে উৎসাহিত করেছিল। আবার কেউ কেউ অনুমান করেন যে, ১৩২৪ খ্রীষ্টাব্দে বরঙ্গল রাজ্য মুসলমান কর্তৃক প্রতিষ্টিত হলে উপরোক্ত পঞ্চভ্রাতা তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে বিজয়নগর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।


অপরদিকে হেরাস (Heras) মনে করেন যে, মহীশূরের হয়সল রাজ তৃতীয় বল্লাল তুঙ্গভদ্রার তীরে থানেগুতি নামে যে নগরটির পত্তন করেছিলেন তাই পরবর্তী কালে বিজয়নগর রাজ্যে পরিণত হয়। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, দক্ষিণ ভারতের মুসলমানদের অত্যাচার থেকে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচিত হয়। দক্ষিণ ভারতে হিন্দু আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন হরিহর, বুক্কা ও তাঁদের অপর তিন ভ্রাতা।

বিজয়নগর সাম্রাজ্যে চারটি রাজবংশ যথাক্রমে ক্ষমতাসীন ছিলেন; যথা—

  1. সঙ্গম বংশ, 
  2. সালুভ বংশ, 
  3. তুলুভ বংশ ও 
  4. আরবিডু বংশ।


ভারতের ইতিহাসে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গুরুত্ব


হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতি রক্ষা:

ভারতের ইতিহাসে বিজয়নগর রাজ্যের উত্থান এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

  • প্রথমতঃ প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই সাম্রাজ্য মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করে হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতি রক্ষা করেছিল।
  • দ্বিতীয়তঃ বিজয়নগর রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষিণ-ভারতে শিল্প ও স্থাপত্যের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছিল।
  • তৃতীয়তঃ বাহমনী রাজাকে অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত রেখে পরোক্ষভাবে বিজয়নগর-রাজারা উত্তর-ভারতে বাহমনী রাজ্যের সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিলেন।
  • চতুর্থতঃ পরবর্তী কালে বৈষ্ণ ধর্মের প্রসারের সঙ্গে বিজয়নগর রাজাদের নাম জড়িত রয়েছে। শিল্প ও স্থাপত্যের উৎকর্ষ করেছিল।


বিজয়নগরে আঞ্চলিক সংস্কৃতির অভ্যুত্থান কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।

  • ১। ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও বিজয়নগরের সংস্কৃতির মধ্যে একটি যোগসূত্র ছিল।
  • ২। দক্ষিণ-ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রে এক সূক্ষ্ম যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়।
  • ৩। তামিল ছাড়া তেলেগু, কানাড়ী ও মারাঠী ভাষায় সংস্কৃতের প্রভাব দেখা যায়। ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে এই ভাষাগুলি সংস্কৃতির বাহন হিসেবে গুরুত্ব লাভ করে।
  • ৪। উত্তর-দাক্ষিণাত্যে বাহমনী সুলতানরা ফার্সী ও আরবী ভাষা প্রবর্তন করে ভাষার ক্ষেত্রে উত্তর-ভারতের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেন।


উত্তর-ভারতের মত বিজয়নগর ও দাক্ষিণাত্যের অন্যান্য হিন্দু রাজ্যে (যথা–হয়সল রাজ্য) সমাজের বিশেষ কয়েকটি শ্রেণীর শিক্ষার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। সায়নাচার্য কর্তৃক রচিত বেদের টাকা সুধীসমাজে আদৃত হয়েছিল। হিমাদ্রী ধর্মশাস্ত্রের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য টীকা রচনা করেন—এর সঙ্গে সমকালীন উত্তর-ভারতে রচিত ধর্মশাস্ত্রের টীকাগুলির বিশেষ কোন পার্থক্য ছিল না। ধর্মের ক্ষেত্রে ভক্তিবাদ উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অঞ্চলেই সমানভাবে প্রসারলাভ করে এবং সম-আদর্শের বিস্তার ঘটে, যদিও সামাজিক প্রতিবাদ রূপে দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদের তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না।


উপকূলবর্তী ব্যবসা-বাণিজ্যে বণিকদের গতিশীলতা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বণিকদের মধ্যে পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। রোমিলা থাপার (R. Thapar)-এর মতে “আঞ্চলিক বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই সময় সমগ্র উপমহাদেশে সাদৃশ্যবোধের স্ফুরণ দেখা যায়, যা সর্বভারতীয় রাষ্ট্রগঠনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল”।


Related Short Question:


১। বিজয়নগর সাম্রাজ্য কে স্থাপন করেন?


উত্তরঃ হরিহর ও বুক্ক


২। বিজয়নগর সাম্রাজ্য কোথায় গড়ে উঠেছিল?


উত্তরঃ তুঙ্গাভদ্রা নদীর দক্ষিণ তীরে


৩। কবে বিজয়নগর সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল?


উত্তরঃ ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে


৪। বিজয়নগরে কয়টি রাজবংশ শাসন করেছিল?


উত্তরঃ ৪টি


৫। বিজয়নগরে শাসনকারী রাজবংশগুলির নাম কি ছিল?


উত্তরঃ ১। সঙ্গম বংশ ২। সালুভ বংশ ৩। তুলুভ বংশ ৪। আরবিডু বংশ


৬। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষার নাম?


উত্তরঃ তামিল, তেলেগু, কানাড়ী ও মারাঠী


৭। চতুর্দশ শতকে দাক্ষিণাত্যের একটি হিন্দু রাজ্যের নাম?


উত্তরঃ হয়সল রাজ্য


৮। বেদের টীকা রচনা করেন কে?


উত্তরঃ সায়নাচার্য


Next Post Previous Post