ভারতীয় গণতন্ত্র গঠনে নেহরুর ভূমিকা সম্পর্কে একটি বিবরণ লেখ।

ভারতীয় গণতন্ত্র গঠনে নেহরুর ভূমিকা

ভারতীয় গণতন্ত্র গঠনে নেহরুর ভূমিকা

১৯৫২ সালে যখন ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় তখন ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের কোনও ঐতিহ্য ছিল না। উপরন্ত ভারতের মতো বহুজাতিক, বহুভাষী ও বহু সম্প্রদায়ে বিভক্ত জনগণের পক্ষে সংসদীয় গণতন্ত্র কতটুকু কার্যকর ও সফল হবে-সেটাই ছিল মূল প্রশ্ন।

গণতন্ত্রের বীজ বপন

সৌভাগ্যের বিষয় নেহরুর সময় গণতন্ত্রে যে বীজ বপন করা হয়েছিল নানা প্রতিকূল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার সাফল্য আজ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। নেহরু জীবিত থাকাকালীন ভারতে যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে বোঝা গিয়েছিল যে ভারতের জনগণ ধীরে ধীরে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি ও ঐতিহ্য রপ্ত করে নিচ্ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সংসদীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষায় ভারত সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিল। নেহরুর সময় ১৯৫২, ১৯৫৭ এবং ১৯৬২ সালে তিনবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ভারতীয়দের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহন

নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পথে। জনগণের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল। শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলে ভোটদাতাদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। কংগ্রেস ছাড়া যেসব দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদের মধ্যে ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, জনসংঘ, সমাজতন্ত্রী দল ও প্রজা সোসালিস্ট পার্টি। মহিলাদের মধ্যে ভোটের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনে কংগ্রেসের সাফল্য ছিল চোখ ধাঁধানো। বিরোধীরা জোট বেঁধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে নির্বাচনে নামেনি। স্বাভাবিক ভাবে তাই অনেক কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল বহুমুখী। লোকসভায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি।
প্রথম সাধারণ নির্বাচনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য অসংখ্য ছোটোখাটো আঞ্চলিক ও স্থানীয় দল ও নির্দল সদস্যের উপস্থিতি।

কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য

জওহরলাল নেহেরুর জীবদ্দশায় আরও দুটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালে। দুটি নির্বাচনেই জনগণের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছিল। ভোটদাতার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল যা প্রমাণ করে যে ভারতীয় জনগণ ক্রমশ সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছিল। এই দুটি নির্বাচনেই কংগ্রেস লোকসভায় তার নিরঙ্কুশ প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখতে সফল হয়।

গনতন্ত্র বিতর্ক

প্রথম তিনটি নির্বাচনের সময় বিরোধী দলগুলি দুর্বল থাকায় ও তাদের কোনও ঐক্য না থাকায় ভারতীয় গণতন্ত্রের সত্যিকারের কোনও পরীক্ষা হয়েছিল কিনা বা গণতন্ত্রের আড়ালে কার্যত কোনও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিনা সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ১৯৪৭-৬৪ সাল পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস কার্যত তাঁকে কেন্দ্র করেই বিবর্তিত হয়েছিল গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এই দৃষ্টান্ত বিরল। অনেকেই তাই বলেন স্বাধীনতার পর ভারতে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা আসলে গণতন্ত্র নয়। কংগ্রেস ও নেহেরুর একনায়কতন্ত্রগণতন্ত্রের কোনও বিকাশ এ সময় হয়নি।

নেহরুর কার্যকলাপের সমালোচনা

এই ধারণার দুটি কারণ আছে—প্রথমটি সাবেকি অর্থাৎ ইংরেজরা বলে এসেছে প্রাচ্যে গণতন্ত্র অচল। দ্বিতীয় ধারণাটি বাস্তব এবং বেশ কিছুটা জোরালো। নেহরুর আমলে গণতন্ত্রের বিকাশের পথই ছিল রুদ্ধ। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ সে সময় ছিল না। বিরোধী দলগুলির পক্ষে নেহরু বা কংগ্রেসের সক্রিয় বিরোধিতা করা সম্ভবপর ছিল না। নেহরুর জীবদ্দশায় সরকার পতনের কোনও ব্যাপার ঘটেনি। অঘটন কেবল ঘটেছিল কেরলে। দু বছরের মধ্যেই অবশ্য সেখানকার কমিউনিস্ট সরকারের পতন হয়েছিল। আয়েশা জালালের মতে, একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে নিয়মিত নির্বাচন হলেও দীর্ঘদিন ধরে একদলীয় শাসন স্বৈরতন্ত্রের রূপ নিচ্ছিল। দল ও সরকার দুয়েতেই নেহরু ছিলেন সর্বেসর্বা এবং কোনও বিরোধিতা তিনি সহ্য করতেন না বলে অভিযোগ করা হয়। মৃত্যুর কয়েকমাস আগেও 'কামরাজ পরিকল্পনা'র মাধ্যমে তিনি নিজ প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখতেন এবং তাঁর অপছন্দের নেতাদের কংগ্রেসে ক্ষমতাহীন করতে চেয়েছিলেন বলে অনেকে তাঁর সমালোচনা করেন।

নেহরু আমলে স্বৈরশাসন

আবার শাসকদল এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে সারা দেশে এক ধরনের স্বৈরাতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়েছিল। কংগ্রেস তথা নেহরু দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বেকার সমস্যা ইত্যাদি কোনও সমাধান করতে পারেনি। নেহরু গণতান্ত্রিক পথ ও পদ্ধতিতে বিশ্বাসী হলেও কোনও দিন আমজনতার সঙ্গে হৃদ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। নেহরু যে গণতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না তার প্রমাণ হিসাবে অনেক সময়ই ১৯৫৯ সালে কেরলের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারকে অপসৃত করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়।

উপসংহার

ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের পথ যে সব সময় অনুকূল ছিল না সে কথা স্বীকার্য। নেহরুর সময় তাঁর নেতৃত্ব ও কংগ্রেসের কোনও বিকল্প ছিল না। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে, ভারতে গণতন্ত্র বলে কিছুই ছিল না। কিন্তু তাঁকে আবার স্বৈরতন্ত্র বলে চিহ্নিত করাও অযৌক্তিক। বিরোধী দলগুলি দুর্বল হলেও দায়িত্ববান ছিল এবং তারাও সংসদের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিল। নেহরুর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা ক্রমশ পরিণত হয়ে উঠেছিল এবং তা ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যরূপে পরিগণিত হচ্ছিল। নেহরু C.P.I.-কে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি গণতন্ত্রের বিরোধী নন। গণতন্ত্রের বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো বাক্ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। নেহরুর সময় ভারত সসম্মানে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। নেহরুর আমলে যেমন কিছু কিছু স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল তেমনই গণতন্ত্রের লক্ষণগুলিও উপস্থিত ছিল। এই ধরনের স্ববিরোধিতাও ছিল। আসলে নেহরুকে ঠিক পুরোপুরি স্বৈরতন্ত্রীও বলা যায় না, আবার গণতন্ত্রী বলেও মনে করা কঠিন।


তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত

Related Short Question:

 1. 1952 সালে ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হয়?

    - ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন 1952 সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক চিহ্নিত করে।

 2. ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রাথমিক উদ্বেগ কী ছিল?

    - প্রাথমিকভাবে, ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল এর বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যা এবং ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের কারণে।

 3. ভারতে কি এর আগে সংসদীয় গণতন্ত্রের কোনো ঐতিহ্য ছিল?

    - 1947 সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের আগে ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ছিল না।

 4. ভারতে বিভিন্ন জনসংখ্যা, ভাষা এবং ধর্মের কারণে সংসদীয় গণতন্ত্র কতটা কার্যকর এবং সফল হবে?

    - ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং সাফল্য সন্দেহের বিষয় ছিল, এর বৈচিত্র্যের কারণে, কিন্তু এটি বছরের পর বছর ধরে স্থিতিস্থাপক এবং কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।

 5. ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কে অংশগ্রহণ করেছিলেন?

    - ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল।

 6. কংগ্রেস ছাড়া কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে সক্রিয় ছিল?

    - কংগ্রেস পার্টি ছাড়াও, নির্বাচনের সময় অন্যান্য সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, জন সংঘ, সমাজতান্ত্রিক দল এবং অন্যান্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 7. শহর ও গ্রামীণ উভয় ক্ষেত্রেই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি কেমন ছিল?

    - শহর ও গ্রামীণ উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য ছিল, ভোটারদের মধ্যে একটি দৃঢ় উৎসাহ এবং অংশগ্রহণ ছিল।

 8. এই নির্বাচনের সময় নেহেরু এবং কংগ্রেসের কোন উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা ছিল কি?

    - বিরোধিতা থাকাকালীন, নেহেরু এবং কংগ্রেস এই নির্বাচনের সময় একটি প্রভাবশালী অবস্থান বজায় রেখেছিল, মূলত তাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে।

 9. নেহেরু এবং কংগ্রেস কি তাঁর অফিসে থাকাকালীন নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্ব বজায় রেখেছিলেন?

    - নেহেরু এবং কংগ্রেস পার্টি তার মেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বেশ কয়েকটি মেয়াদে প্রসারিত হয়েছিল।

 10. নেহরুর শাসন শৈলী কীভাবে ভারতের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে প্রভাবিত করেছিল?

 - গণতান্ত্রিক নীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকার দ্বারা চিহ্নিত নেহেরুর শাসন শৈলী, ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি গঠনে এবং রাজনৈতিক বিরোধীতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রে অবদান রাখে।
Next Post Previous Post