ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকর কার্যাবলী আলোচনা কর।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকর কার্যাবলী


পূর্বসূরী মহম্মদ বিন তুঘলকের মত ফিরোজ শাহ তুঘলকও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, শাসন সংস্কার ও জনকল্যাণের আদর্শ গ্রহণ করেন। তিনি রাষ্ট্রকে একটি প্রজাহিতৈষী প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করতেন। তিনি নিজের লেখা ফুতুহ-ই-ফিরোজশাহী গ্রন্থে বলছেন, "ঈশ্বরের ইচ্ছাকেই আমি একজন দিন সেবক হিসেবে কাজে রূপায়িত করার চেষ্টা করছি।" তাঁর ধর্মনিষ্ঠা, নমনীয় চরিত্র এবং প্রজা কল্যাণকর কাছের জন্য সমসাময়িক মুসলমান ঐতিহাসিকরা তাঁকে "আদর্শ মুসলমান নরপতি" বলে অভিহিত করেছেন। ইংরেজ ঐতিহাসিক হেনরি ইলিয়ট, এলফিন স্টোন তাঁকে "সুলতানি যুগের আকবর" বলে অভিহিত করেছেন।

রাজস্ব সংস্কার:

মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে কুশাসন, দুর্ভিক্ষ ও বলপূর্বক কর আদায় প্রভৃতির ফলে প্রজাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। এই অবস্থা থেকে প্রজাদের মুক্তির জন্য তিনি কতগুলি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন,

  • প্রথমতঃ দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর জন্য প্রদত্ত কৃষি ঋণ থেকে প্রজাদেরকে মুক্তি দেন।
  • দ্বিতীয়তঃ পূর্ববর্তী সুলতানের পরিকল্পগুলির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রজাদের ক্ষতিপূরণ দান করেন।
  • তৃতীয়তঃ ২৪ রকমের "আবয়াব" বা অবৈধ কর তুলে দেন এবং কোরান নির্দেশিত চার প্রকার কর যথা খারাজ, খামস, জাকাত ও জিজিয়া কর ধার্য করেন।
  • চতুর্থতঃ আর্থিক উন্নতির জন্য বাণিজ্যক্ষেত্রে আন্তঃপ্রাদেশিক শুল্ক তুলে দেন।

সেচ ব্যবস্থা:

কৃষির উন্নতির জন্য ফিরোজ শাহ তুঘলক সেচ ব্যবস্থার সংস্কার করেন। "তারিখ-ই-মুবারকশাহী" গ্রন্থে তাঁর সেচ প্রকল্পের বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বহু খাল খনন ও সংস্কার করেছিলেন। এগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল 

  • ১। ৫০ মাইল দীর্ঘ যমুনা থেকে ভিসার পর্যন্ত খাল 
  • ২। ৯৬ মাইল দীর্ঘ শতদ্রু থেকে ঘর্ঘরা পর্যন্ত খাল।
  • ৩। ঘর্ঘরা থেকে ফিরোজাবাদ পর্যন্ত খাল।

এছাড়াও তিনি ৫০ টি বাঁধ নির্মাণ এবং ১৫০ টি পুকুর ও কুপ খনন করেন।

মুদ্রা ব্যবস্থা:

ফিরোজ শাহ তুঘলক নির্ভরযোগ্য মুদ্রা অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি স্বল্পমূল্যের মুদ্রা 

  1. জিতল
  2. আধা,
  3. বিখ,

চালু করেন। এই স্বল্প মূল্যের খুচরা মুদ্রা প্রচলিত হওয়ার ফলে মানুষের কেনাবেচার সুবিধা হয়।

জনহিতকর কাজ:

ফিরোজ শাহ তুঘলক তাঁর জনকল্যাণমূলক ও প্রজাহিতৈষী কার্যাবলী জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন।

  • প্রথমতঃ বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি দিল্লিতে একটি "কর্মসংস্থান সংস্থা" প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে বেকার ও যোগ্য ব্যক্তিদের চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
  • দ্বিতীয়তঃ দরিদ্রদের চিকিৎসার জন্য "দার-উল-সাফা" নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন।
  • তৃতীয়তঃ দরিদ্র মুসলমান বিধবা নারীদের বিবাহযোগ্য কন্যাদের বিবাহের অর্থ সাহায্যের জন্য তিনি "দেওয়ান-ই-খায়রাত" নামে একটি দাতব্য বিভাগ স্থাপন করেন।
  • চতুর্থতঃ যোগ্য ব্যক্তিদের অর্থ সাহায্যের জন্য "দেওয়ান-ই-ইস্তিহক" প্রতিষ্ঠা করেন।

শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক:

শিক্ষার প্রতি ফিরোজ শাহ তুঘলকের প্রবাল আগ্রহ ছিল। তিনি বেশ কিছু মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের অনুদান ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে পন্ডিত আনার ব্যবস্থা করেন। তিনি ৩ টি কলেজ ও ৩০ টি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকার কার্যাবলীর জন্য সমসাময়িক ঐতিহাসিক বারণী ও আফিফ থেকে শুরু করে বর্তমান ঐতিহাসিক ইলিয়ট, এলফিনস্টোন এমন কি শ্রীবাস্তব ফিরোজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অনেক ঐতিহাসিক এর মতে ফিরোজ শাহ রাজত্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকবরের রাজত্বের পূর্ব পর্যন্ত ভারত ইতিহাসে সবথেকে গৌরবময় অধ্যায় শেষ হয়। তাঁর প্রশংসায় উলসি হেগ বলেন যে, "The reign of Firuz closes the most brilliant epoch of muslim rule in India before reign of Akbar."

Related Short Question:

1. ফিরোজ তুঘলকের রাজত্বকালের প্রধান উপাদানগুলি লেখ? 

ঐতিহাসিক উপাদানগুলি হল—

  • ১) জিয়াউদ্দিন বারনি রচিত 'তারিখ-ই-ফিরোজশাহী
  • ২) শামস-ই-সিরাজ রচিত “তারিখ-ই-ফিরোজশাহী। 
  • ৩) সুলতানের আত্মজীবনী 'ফুতুহাৎ-ই-ফিরোজশাহী
  • ৪) “আইন-ই-মহরু' ও ‘সিরাত-ই-ফিরোজশাহী

2. ফিরোজ শাহ নির্দেশিত চার প্রকারের করের নাম লেখো ?

ফিরোজ শাহ ২৪ রকমের অবৈধ কর তুলে দিয়ে কোরান নির্দেশিত চার প্রকারের কর আদায় করতেন। সেগুলি হল 

  • ১) খারাজঃ উৎপন্ন ফসলের এক দশমাংশ। 
  • ২) খামস্ঃ যুদ্ধক্ষেত্রে লুণ্ঠিত দ্রব্যে এক পঞ্চমাংশ। 
  • ৩) জাকাৎঃ মুসলিমদের কাছ থেকে ধর্মকর হিসেবে তাদের আয়ের আড়াই শতাংশ। 
  • ৪) জিজিয়াঃ অমুসলিমদের কাছে আসাধীকৃত কর।

3. 'হক-ই-শাব' বা সেচকর কী?

রাষ্ট্রের কৃষির উন্নতির জন্য ফিরোজ শাহ তুঘলক উলেমাদের অনুমতিক্রমে রাষ্ট্রীয় খাল থেকে যেসব জমিতে জলসেচ করা হতো তার উপর জমির উৎপাদনে একে দশমাংশ কর আরোপ করেন। এই কর 'হক-ই-শাব' বা সেচকর নামে পরিচিত।

4. ফিরোজ তুঘলকের মুদ্রানীতি উল্লেখ কর ? 

তিনি খাঁটি সোনা ও রূপার মুদ্রা চালু করে সরকারি মুদ্রার ওপর জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি করেন। তিনি স্বল্পমূল্যের মুদ্রা — জিতল', 'অর্ধজিতল' বা 'আধা', সিকি জিতল বা বিখ' চালু করেন। 

5. বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে ফিরোজ তুঘলক কি পরিবর্তন করেন? 

শরিয়ত বিধান অনুযায়ী তিনি বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিন্তু পরিবর্তন আনেন। তিনি নিষ্ঠুর শাস্তি প্রদান যেমন, অঙ্গচ্ছেদ, হাতির পদতলে পৃষ্ঠ করা, মুণ্ডচ্ছেদ প্রভৃতি বাতিল করেন এবং বিচার পরিচালনার জন্য একজন কাজি নিয়োগ করেন।

6. সামরিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ফিরোজ তুঘলক কি ব্যবস্থা নেন?

সংগঠিত ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য ফিরোজ তুঘলক — 

  • ১) সেনাদলে 'দাগ' ও 'হুলিয়া" প্রথার প্রবর্তন করেন। 
  • ২) সেনাপদ বংশানুক্রমিক করেন। 
  • ৩) যুদ্ধে ভাড়াটে সেনা নিয়োগ করেন। 
  • ৪) সেনাবাহিনীর ভার প্রাদেশিক কর্মচারীদের হাতে তুলে দেন।
  • ৫) সেনাবাহিনীকে বেতনের পরিবর্তে জায়গীর দেন।

7. ফিরোজ শাহ কর্মসংস্থান কি?

বেকার সমস্যার সমাধানের জন্য ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লীতে একটি কর্মসংস্থান স্থাপন করেন। এখানে দিল্লীর বেকার যুবকদের তালিকা তৈরি করা হয় এবং যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরির ব্যবস্থা করা হয়। 

8. ‘দার-উল-সাফা' কী?

দরিদ্র ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য ফিরোজ শাহ তুঘলক দার একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। এখান থেকে দরিদ্র ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। 

9. 'দেওয়ান-ই-খয়রাত' কী?

দেশের দুঃস্থ ব্যক্তিদের সাহায্যের জন্য ফিরোজ শাহ তুঘলক 'দেওয়ান-ই-খয়রাত' নামে একটি দাতব্য বিভাগ স্থাপন করেন। এই দপ্তর থেকে মুসলিম, অনাথ, দুস্থ বিধবাদের কন্যাদায়গ্রস্ত পিতামাতাকে সাহায্য করা হতো।

10. 'দেওয়ান-ই-ইস্তিহক' কী? 

যোগ্য ব্যক্তিদের আর্থিক সাহায্য দানের জন্য ফিরোজ শাহ তুলক দেওয়ান-ই-ইস্তিহক' নামে সরকারি বিভাগ স্থাপন করেন। এখান থেকে প্রতি বছর টাকা সাহায্য করার ব্যবস্থা ছিল। আফিফ এর মতে, ৪২০০ জন ব্যক্তি এই র থেকে সাহায্য পেত।

Next Post Previous Post