ভক্তি আন্দোলন সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা আলোচনা কর।

 ভক্তি আন্দোলন টীকা


ভক্তি আন্দোলনের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মত পার্থক্যের অন্ত নেই। কিছু ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ম্যক্স ওয়েবার, গিয়ারসন প্রমুখর মতে, ভক্তি এবং একেশ্বরবাদে ধারণা খ্রীষ্ট ধর্ম থেকে নেওয়া। আবার কিছু মুসলিম ঐতিহাসিক যেমন ডক্টর তারা চাঁদ, ইউসুফ হোসেন প্রমুখের মতে, ভক্তিবাদের বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সাম্য প্রভৃতি ইসলাম ধর্ম থেকে নেওয়া। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে। তবে সম্ভবতঃ মধ্যযুগের ভক্তিবাদের উৎপত্তি ও প্রসার ইসলামের পরোক্ষ ফল। কারণ ভারতে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ও ধর্মান্তরিত করার ঘটনা যে সংকটে সৃষ্টি করেছিল তার ফলেই ভক্তিবাদের প্রসার ঘটে।


যাইহোক এই ভক্তি প্রচারকরা প্রায় সকলেই এক সুরে কথা বলেছেন। এরা সকলেই ভক্তির মাধ্যমে মুক্তির কথা বলেছেন। যা ছিল ভক্তিবাদের মূল কথা। তবে এদের মতে এই কাজের জন্য একজন গুরুর প্রয়োজন। ভক্তি প্রচারকরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ধনী-নিধন নির্বিশেষে সকলকেই কাছে টেনে নিয়েছেন। যেহেতু তারা ভক্তির মাধ্যমে মুক্তির কথা বলতেন তাই তাদের আন্দোলন "ভক্তি আন্দোলন" নামে পরিচিত হয়। এই ভক্তি প্রচারকদের মধ্যে অন্যতম হলেন,


রামানুজ:

ভক্তিবাদের আদি প্রচারক ছিলেন। তাঁর মতে কর্মের দ্বারাই আসক্তি সৃষ্টি হয়। কেবলমাত্র ভক্তিযোগই মুক্তির পথ দেখায়। তাই রামানুজের আদর্শে দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলনের প্রসার লাভ করে।


রামানন্দ:

রামানুজের শিষ্য ছিলেন রামানন্দ। তিনি একেশ্বরবাদীর প্রচার করেন এবং জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে ভক্তিবাদের প্রচার করেন। তাঁর অন্যতম শীর্ষরা ছিলেন মুচির রবিদাস, মুসলিম তাঁতি কবির, কসাই সাধন। তাঁর আদর্শে উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলন প্রবল রূপ ধারণ করে।


নানক:

ভক্তিবাদের অন্যতম প্রচারক ছিলেন গুরু নানক। অল্প বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করে সুফি সাধকদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু কিছুকাল পর তিনি সুফিদের সঙ্গ ত্যাগ করে একেশ্বরবাদ এর প্রচার করতে থাকেন। তিনি মূর্তি পূজা, তীর্থ যাত্রা, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতির বিরোধী ছিলেন। তাঁর মূল মন্ত্র ছিল ধর্মের জটিল ও বাহ্যিক আড়ম্বর থেকে মুক্ত হয়ে সত্যের স্বরূপ ভগবানের আরাধনা। তাঁর শিষ্যরা "শিখ" নামে পরিচিত ছিল।


শ্রীচৈতন্য:

বাংলায় ভক্তিবাদী এর জোয়ার আনেন ভক্তি সাধক শ্রীচৈতন্য। তিনি নদীয়ার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তর্কশাস্ত্র ও দর্শন শাস্ত্রের সুপন্ডিত ছিলেন। দিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভক্তিবাদের প্রচার করতে থাকেন। তিনি ঘোষণা করেন একাগ্র চিত্রে ভক্তিবাদ জাগরণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শক্তির স্পর্শ পাওয়া যায়। আর এই আধ্যাত্মিক ভাব জাগরনের জন্য শ্রীচৈতন্য "নামসংকীর্তন" উপর জোর দেন। তার অগণিত শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নিত্যানন্দ, শ্রীবাস, যবন হরিদাস প্রমুখ।


কবির:

ভক্তিবাদের ওপর প্রচারক হলেন কবির। তিনি ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁতির ঘরে পালিত হন। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন রামানন্দের ভক্ত, পরে তিনি নিজস্ব মতামত প্রচার করেন। তিনি বলতেন, ঈশ্বর এক এবং অভিন্ন। আল্লাহ ও রাম এই ঈশ্বরের ভিন্ন নাম। তিনি আরো বলতেন, ঈশ্বর মসজিদে নেই, মন্দিরে নেই, কাবাতেও নেই, কৈলাসেও নেই, যার যাগ-যজ্ঞে নেই - ঈশ্বর আছেন মানুষের হৃদয়। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় শ্লোকের মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচার করতেন। এইগুলি কবিরের "দোঁহা" নামে পরিচিত।


মীরাবাঈ:

ভক্তি আন্দোলনের ইতিহাসের রাজপুত কুলবধূ মীরাবাঈ ছিলেন এক উল্লেখযোগ্য নাম। অল্প বয়সে কৃষ্ণ প্রেমে তিনি মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন। গিরিধারীর প্রতি বিভোর হয়ে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে মথুরা ও বৃন্দাবনে কৃষ্ণ নাম করতে থাকেন। সংগীতের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ভক্তি অর্ঘ নিবেদন করতেন। "মীরার ভজন" নামে পরিচিত তাঁর ভক্তিমূলক গান আজও ভারতীয় সংগীতের অমূল্য সম্পদ।


Related Short Question:


 1. ভক্তি আন্দোলন কি?

সুলতানি যুগের হিন্দুধর্মের একদল সংস্কারবাদী সাধকের আবির্ভাব ঘটে। যারা অন্তরের ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্যলাভের কথা প্রচার করেন। এদের মূল লক্ষ্য ছিল আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন এবং সমাজের সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ভালোবাসার বাণী প্রচার ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা। এই সংস্কারবাদী সাধকদের আন্দোলন ভক্তি আন্দোলন নামে পরিচিত।


 2. ভক্তি আন্দোলন কখন সংঘটিত হয়?

    - ভক্তি আন্দোলন ভারতে সপ্তম থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।


 3. ভক্তি আন্দোলনের উৎপত্তি কোথায়?

    - এটি দক্ষিণ ভারতে (তামিলনাড়ু) এবং উত্তর ভারতে (বাংলা, পাঞ্জাব, ইত্যাদি) বিশিষ্ট স্কুলগুলির সাথে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্ভূত হয়েছিল।


 4. কেন ভক্তি আন্দোলনের উদ্ভব হয়েছিল?

    - এটি আচার-অনুষ্ঠান এবং বর্ণ-ভিত্তিক বৈষম্যের প্রতিক্রিয়া হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল, দেবতার প্রতি সরাসরি ব্যক্তিগত ভক্তির উপর জোর দেয়।


 5. ভক্তি আন্দোলনের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব কারা ছিলেন?

    - বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে রামানুজ, চৈতন্য, কবির, মীরাবাই এবং তুলসীদাস।


6. রামানুজ কে ছিলেন?

ভক্তিবাদের আদি প্রচারক ছিলেন রামানুজ, দক্ষিণ ভারতের শ্রীপেরাম পুদুরে তাঁর জন্ম হয়। কাী ও শ্রীরঙ্গনকে কেন্দ্র কের ভক্তিবাদের প্রচার করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কর্মের দ্বারা আসক্তি ও মায়ার উদ্ভব হয়। একমাত্র ভক্তির মাধ্যমে মুক্তি লাভ সম্ভব।


7. কবীর পন্থী কাদের বলে?

পঞ্চদশ শতকে ভক্তিবাদের অন্যতম সাধক ছিল কবীর। তিনি রামানন্দের শিষ্য ছিলেন। তিনি জাতিতে মুসলমান হয়েও সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির বাণী প্রচার করেন। তাই হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এই শিষ্যদের কবীরপন্থী বলা হতো।


8. দোঁহা কী?

ভক্তিবাদের প্রচারের উদ্দেশ্যে সাধক কবীর হিন্দী ভাষা, ছোটো ছোটো কবিতা রচনা করেন। সেগুলির মাধ্যমে তিনি সহজ সরল ভাষায় ভক্তিবাদের মাহাত্ম প্রচার করতেন। তার এই গীতিমূলক কবিতাগুলি দোঁহা নামে পরিচিত।


9.  গুরু নানক কে ছিলেন?

সুলতানি যুগে অন্যতম ভক্তি প্রচারক ছিলেন গুরু নানক। ধর্মের জটিল ও বাহ্যিক আড়ম্বর থেকে মুক্ত হয়ে 'সৎ-শ্রী আকাল', অর্থ্যাৎ সত্যস্বরুপ ভগবানের আরাধনার কথা প্রচার করতেন। তিনি মনে করতেন নাম বা ঈশ্বরের গুণগান, দান বা জীবসেবা, ও স্নান বা দেহের শুদ্ধির মাধ্যমে আত্মার উন্নতি সম্ভব। তাঁর শিষ্যরা 'শিখ' নামে পরিচিত। তাঁর উপদেশ বাণী অবলম্বন করে শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গ্রন্থসাহেব রচিত হয়।

Next Post Previous Post