প্রথম পানিপথের যুদ্ধ অপেক্ষা খানুয়ার যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কেন?

 প্রথম পানিপথের যুদ্ধ সঙ্গে খানুয়ার যুদ্ধের তুলনা


১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পানিপথের যুদ্ধ মোঘল সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় এই যুদ্ধে বাবরের জয়লাভের ফলে ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচিত হয়েছিল এবং দিল্লির লোদী বংশের ক্ষমতা চিরতরে বিলুপ্তি হয়েছিল এরপর থেকে শুরু হয় দিল্লি কেন্দ্রিক মুঘল সাম্রাজ্যের উজ্জ্বল অধ্যায়।


কিন্তু প্রথম পানিপথের যুদ্ধের ফলে সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাবরের হস্তগত হয়নি। এর জন্য তাকে মেবারের রাজপুত রানা সংগ্রাম সিংহের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর এস. রায় তাঁর "The Mughal Empire" গ্রন্থে (পাতা ৩৫) এ বলছেন, "It could not finally decide the fate of Hindustan." কারণ এই যুদ্ধের ফলে বাবর কেবলমাত্র দিল্লির সিংহাসন লাভ করে, সমগ্র ভারতবর্ষ নয়। যুদ্ধের গুরুত্ব প্রসঙ্গে কে. কে. দত্ত মন্তব্য করেছেন, "পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ছিল ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের স্থাপনের প্রথম পদক্ষে মাত্র।"


সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপী সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রশ্নে বাবরকে রাজপুত শক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে রাজপুত রানার সংগ্রাম সিংকে বাবর পরাজিত করেন। এর ফলে ভারতের রাজপুত প্রাধান্য স্থাপনের স্বপ্ন চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই যুদ্ধের পর সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী প্রাধান্য স্থাপনে বাবরকে বাধা দানকারী শক্তি হিসেবে আর কোন শক্তি ছিল না। তাই ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ মন্তব্য করেছেন, "The battle of Khanwah is one of the decisive battle of Indian history."


ঐতিহাসিক এস. রায়ের মতে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ অপেক্ষা খানুয়ার যুদ্ধ ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • প্রথমতঃ পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাবর ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল মাত্র। কিন্তু খানুয়ার যুদ্ধে মুঘল সাম্রাজ্য কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় হয়েছিল এবং তার সম্প্রসারণের পথ প্রশস্থ হয়েছিল।
  • দ্বিতীয়তঃ পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মোগল প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তরিত হলেও খানুয়ার যুদ্ধের পর মুঘলদের রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু কাবুল থেকে আগ্রায় স্থানান্তরিত হয়েছিল।


পরিশেষে ঐতিহাসিক রাশব্রুক উইলিয়ামের মতকে অনুসরণ করে বলতে পারি, বাবর যদি খানোয়ার যুদ্ধ জয়লাভ না করতেন তাহলে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ নিষ্ফল হত এবং দিল্লির ক্ষমতা দখল বাবরের জীবনে দুঃসাহসিক অভিযান বলেই গণ্য হত। খানুয়ার যুদ্ধ জয় লাভের পর বাবরকে যে সকল যুদ্ধ করতে হয়েছিল সেগুলি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নয়, - সাম্রাজ্যের বিস্তার, বিদ্রোহ দমন এবং শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই ঐতিহাসিক কালী কিংকর দত্ত তাঁর "An Advanced History of India" গ্রন্থে (পাতা ৪২৯) মন্তব্য করেছেন, "The battle Khanu…its results were more significant than those of the first battle of Panipath."

Related Short Question:

১। কবে কাদের মধ্যে পাণিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়? 

১৫২৬ খ্রীঃ দিল্লীর লোদী বংশীয় শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীর সঙ্গে ফরঘনা রাজ্যের অধিপতি বাবরের পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বাবর জয়লাভ করেন।

 

2। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের সাফল্যের কারণ কি ছিল?

পনিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের সাফল্যের কারনগুলি হল -

১) বাবরের বিশাল সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। 

২) তার ব্যক্তিগত রণদক্ষতা। 

৩) যুদ্ধে তুলঘুমা ও রুমিনীতির প্রয়োগ। 

৪) যুদ্ধে দ্রুত গতি সম্পন্ন অশ্বারোহীর ব্যবহার। 

৫) যুদ্ধে কামান ও বন্দুকের ব্যবহার। 

৬) ভারতীয় সেনাবাহিনীর দূর্বলতা।


৩।  প্রথম পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব কী ছিল?

প্রথম পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব হল

১) লোদী বংশের শাসন চিরতরে বিলুপ্ত হয়।

২) দিল্লী ও আগ্রা সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল বাবরের অধিকারে আসে।

৩) গঙ্গা যমুনার সমৃদ্ধ উপত্যকা বাবরের কাছে উন্মুখ হয়। 

(৪) ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। 

৫) ইব্রাহিম লোদীর সঞ্চিত ধনদৌলত বাবরের হস্তগত হয়।


৪। তুলঘুমা ও রুমি কৌশল কী?

বাবর উজবেকি ও তুর্কীদের কাছ থেকে এক নতুন ধরনের যুদ্ধ কৌশল আয়ত্ব করেন। এর নাম হল 'তুলঘুমা'। গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন অশ্বারোহী বাহিনীর যৌথ আক্রমণই হল তুলঘুমা পদ্ধতি।

অন্যদিকে বাবর যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন এক পদ্ধতি অনুসরণ করেন যা রুমি পদ্ধতি নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীর সামনে গোরুরগাড়ি, ঠেলাগাড়ি বা মাটির টিবি তৈরি করে কৃত্রিম প্রাচীর তৈরী করে তার পশ্চাতে কামান রেখে যুদ্ধ করা হত।


৫। কবে কাদের মধ্যে খানুয়ার যুদ্ধ হয়? 

১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রির কাছে মেবারের রানা সংগ্রাম সিং এর সাথে বাবরের যে যুদ্ধ হয় তা খানুয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে বাবর জয়লাভ করেন।


৬। খানুয়ার যুদ্ধের গুরুত্ব লেখ?

এই যুদ্ধের ফলে - 

১) ভারতে মোঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। 

২) রাজপুতদের পরাজয়ের ফলে তাদের হিন্দুরাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন চিরতরে বিলুপ্ত হয়।

৩) মোঘলদের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু কাবুল থেকে আগ্রায় স্থানান্তরিত হয়।

Next Post Previous Post