সুফিবাদের মূল তত্ত্ব গুলি আলোচনা করো।

 সুফিবাদের মূল তত্ত্ব

সুলতানি যুগের মুসলিম ধর্মে এক উদারনৈতিক সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় যা সুফি আন্দোলন নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক ইউসুফ হোসেনের ভাষায়, "It was born in the bosom of Islam." (ইসলামের বক্ষ দেশ থেকে সুফিবাদের জন্ম।) সুফিবাদিরা কোরানের শিক্ষা ও মহম্মদের আদর্শে বিশ্বাসী হলেও তারা ইসলাম নির্দিষ্ট ধর্ম পালন পদ্ধতি ও আচার অনুষ্ঠানে বিরোধী ছিলেন। বাহ্যিক অনুষ্ঠানের পরিবর্তে তারা ঈশ্বরের করুণা লাভের জন্য অন্তরের পবিত্রতার উপর জোর দিতেন। তারা বিশ্বাস করতেন প্রেম ও ভক্তি ঈশ্বর লাভের প্রধান উপায়।


সুফি কথাটি এর উদ্ভব নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে নানান বিতর্ক আছে। তাদের মতে,

  • প্রথমতঃ সাফা বা পবিত্রতা থেকে সুফি কথাটি এসেছে। যারা দেহ মন ও আচরণের পবিত্রতার উপর জোর দিতেন।
  • দ্বিতীয়তঃ সাফ বা সারিবদ্ধ ভাবে দন্ডায়মান মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে উপনীত হওয়ার জন্য শীর্ষে থাকতেন সুফিরা।
  • তৃতীয়তঃ সুফা থেকে সুফি কথার উৎপত্তি। এই সকল সাধকরা হযরত মহম্মদ এর ঘনিষ্ঠ সহচর আলাফ-উল-সুফ এর সমকক্ষ ছিলেন। তাই তারা সুফি নামে পরিচিত হয়।
  • চতুর্থতঃ সুফ অর্থাৎ এই সাধকরা মোটা পশমের পোষাক পরত বলে এদের সুফ বলা হয়।


সুফি সাধকরা অতীন্দ্রিয়বাদ ও কোরানের ভাগবত ব্যাখ্যার উপর জোর দিতেন। তারা ত্যাগ, বৈরাগ্য, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, পবিত্রতা, উপবাস প্রভৃতির উপর গুরুত্ব দিতেন। ইসলাম নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও আচরণের উপর তাদের অনীহা ছিল। প্রথম পর্বের বিখ্যাত সুফি সাধকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুফি রাবেয়া (অষ্টম শতক), মনসুর বিন উল্লাহ (দশম শতক) এরা প্রত্যেকেই প্রেম এবং ভক্তিকেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথ বলে মনে করতেন। তারা প্রচার করেন সর্বভূতেই ঈশ্বরের সাথে মানুষের মিলন সম্ভব।


সুফিবাদে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। গুরুকে পীর বা খাজা বলা হত। ঈশ্বরের সাথে আত্মার মিলনের জন্য পীর শিষ্যকে সঠিক পথ বা পদ্ধতি সন্ধান দেন। এদের মতে পীরের সান্নিধ্য ছাড়া স্বর্গীয় আশীর্বাদ পাওয়া সম্ভব নয়। তাই গুরু নেতৃত্বে ও প্রদর্শিত পথের অখন্ড প্রেম ভাবনার দ্বারা স্রষ্ঠা ও সৃষ্টির মিলন সম্ভব।

কোন কোন গরু ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য দশটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন।

  1. তত্তবা বা অনুশোচনা
  2. ওয়ারা বা লোভ দমন
  3. ফকর বা আনন্দের সঙ্গে দারিদ্র্য বরণ
  4. সরব বা মহনশীলতা অর্জন
  5. শুকর বা কৃতজ্ঞতা
  6. খুফ বা পাপকে ভয় করা
  7. রোজা বা আল্লাহর করুণা লাভের আকাঙ্ক্ষা
  8. রিজা বা ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ
  9. তওয়াক্কুল বা ভালো মন্দ সবকিছুই গ্রহণ
  10. জুহুদ বা নৈতিক বিধি পালন


সুফিরা সাধারণত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল।

  1. বা-সরাঃ একদল সুফি সাধক ইসলামীয় আইন কানুন বা সরা অনুসরণ করতেন, তাই এরা বা-সরা নামে পরিচিত ছিল।
  2. বে-সরাঃ অপর একদল সুফি সাধক কোন ধরনের ইসলামীয় নিয়মে আবদ্ধ না থেকে মুক্তভাবে অন্তরের বিকাশে আস্থাবান ছিলেন, এরা বে-সরা নামে পরিচিত ছিল।


ভারতে আসার আগে সুফিদের মধ্যে অসংখ্য সিলসিলা (১৪ টি সিলসিলাহ ছিল) বা সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। তবে ভারতে এই দুটি সুফি সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

  • ১। চিশতী সম্প্রদায়ঃ এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশতী। এই সম্প্রদায় আজমির, দিল্লি, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার, দাক্ষিণাত্যে প্রভাব বিস্তার করে।
  • ২। সুহরাবর্দি সম্প্রদায়ঃ এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সেখ শিহাব উদ্দিন উমর। এই সম্প্রদায়ের সিন্ধু, পাঞ্জাব, মুলতানে প্রভাব বিস্তার করে।

এছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি সিলসিলা হলো নকশবন্দিয়া, কাদিরিয়া, ফিরদৌসী প্রভৃতি।

Related Short Question:

প্রশ্নঃ সুফিবাদ কি?

 উত্তর: সুফিবাদ ইসলামের একটি অতীন্দ্রিয় শাখা যা ঈশ্বরের আধ্যাত্মিক নৈকট্য খোঁজার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।

 প্রশ্ন: সুফিবাদের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য কী?

 উত্তর: সুফিবাদের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হল ঈশ্বরের সাথে গভীর, ব্যক্তিগত সংযোগ অর্জন করা।

 প্রশ্ন: সুফিরা কীভাবে আত্ম-আবিষ্কার অনুশীলন করেন?

 উত্তর: সুফিরা ধ্যান, প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক প্রতিফলনের মাধ্যমে আত্ম-আবিষ্কার অনুশীলন করেন।

 প্রশ্নঃ একজন সুফি ওস্তাদ বা পথপ্রদর্শকের তাৎপর্য কী?

 উত্তর: একজন সুফি ওস্তাদ, বা "শেখ", শিষ্যদের তাদের আধ্যাত্মিক যাত্রায় পথ দেখান এবং প্রজ্ঞা প্রদান করেন।

 প্রশ্ন: সুফিবাদে সঙ্গীত ও নৃত্যের ভূমিকা কী?

 উত্তর: ঘূর্ণায়মান দরবেশদের মতো সঙ্গীত এবং নৃত্য, আধ্যাত্মিক আনন্দ এবং সংযোগ প্ররোচিত করতে সুফিবাদে ব্যবহৃত হয়।

 প্রশ্নঃ সুফিবাদ কি শুধু ইসলামের মধ্যেই প্রচলিত?

 উত্তর: ইসলামের মধ্যে সুফিবাদ চর্চা করা হয় কিন্তু অন্যান্য আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে।

 প্রশ্নঃ কিছু সাধারণ সুফী নীতি কি কি?

 উত্তর: সাধারণ সুফি নীতির মধ্যে রয়েছে প্রেম, নম্রতা এবং বস্তুবাদ থেকে বিচ্ছিন্নতা।

 প্রশ্নঃ সুফিবাদ কিভাবে সকল ধর্মের ঐক্যের উপর জোর দেয়?

 উত্তর: সুফিবাদ তাদের মধ্যে ভাগ করা আধ্যাত্মিক সত্যকে তুলে ধরে সকল ধর্মের ঐক্যের উপর জোর দেয়।

Next Post Previous Post