সুলতানি যুগে ভারতে প্রধান সুফী সিলসিলাগুলি কী ছিল?

সুলতানি যুগে ভারতে সুফী সিলসিলা


ভারতে আসার আগেই সুফীরা কতকগুলি সিলসিলা বা সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে যায়। এই সময় তারা দুটি প্রধান দলে বিভক্ত হয়ে ছিল। যথা বা - শরা অর্থাৎ যারা শরিয়ত বা ইসলামীয় আইন মেনে‌ চলত এবং বে - শরা অর্থাৎ যারা তা মানতো না। ভারতে এই দুই সম্প্রদায়কে দেখা গিয়েছিল। ভারতে সুলতানি আমলে বিভিন্ন সুফি সিলসিলা (১৪ টি আধ্যাত্মিক সিলসিলাহ বা বংশ) সুফিবাদ এবং ইসলামী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এখানে কিছু প্রধান সুফি সিলসিলাগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:

ভারতের সুফি সিলসিলা ও প্রচারক

সিলসিলা প্রচারক
চিশতী মঈনুদ্দিন চিশতী, হামিদুদ্দিন নাগৌরী, বখতিয়ার কাকী, বাবা ফরিদ, নিজামুদ্দিন আউলিয়া, নাসিরুদ্দিন চেরাগ-ই দেহলভী, কুতুবন
সুরাবর্দি বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, সদরউদ্দিন আরিফ, শেখ রুকনুদ্দীন, শেখ জমালী কম্বোহ, হামিদুদ্দিন নাগৌরী, শেখ জালালুদ্দিন সুর্য বুখারী (সুর্য পোশ), সৈয়দ জালালুদ্দীন জাহানিয়ান জাহান গশত, শেখ মুসা, শাহ দৌলা দারিয়াই।
ফিরদৌসিয়া সরফুদ্দীন ইয়াহিয়া মানহেরি
কাদিরিয়া আব্দুল কাদির জিলানী, শেখ মুসা, মিয়াঁ মীর, আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী, মোল্লা শাহ বদখশী।
নকশবন্দী বাকী বিল্লাহ, শেখ আহমদ সিরহিন্দী, শেখ মাসুম, মির্জা মজহর জান-ই-জাহান, শাহ ওয়ালী উল্লাহ, খাজা মীর দর্দ।

 1. চিশতী সিলসিলা:

দ্বাদশ শতকে খাজা মইনুদ্দিন চিশতী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত চিশতী সিলসিলাটি ছিল ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সুফি সিলসিলা। তারা ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা এবং ভক্তির পাশাপাশি মানবতার সেবার উপর জোর দিয়েছিল। চিশতী সাধকগণ ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের জন্য "সাম" বা আধ্যাত্মিক সঙ্গীত ও কবিতার ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। বিশিষ্ট চিশতী সাধকদের মধ্যে রয়েছেন খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী এবং বাবা ফরিদ।

হেখটের চিশত শ্রম থেকে এই সম্প্রদায়ের চিশতী নামকরণ হয়। খাজা মইনুদ্দিন চিশতী ভারতে চিশতী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর খানকা ছিল আজমীরে। তিনি পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয়ের অল্পকাল পরেই আজমীরে আসেন। ১২৩৬ খ্রীঃ তাঁর মৃত্যু হয়। তার সরল জীবনযাত্রা ও সহনশীল নীতির জন্যে বহু রাজপুত তাঁর অনুরক্ত হয়।

শেখ হামিদউদ্দিন নাগোরী রাজপুতানার নাগোরে রাজপুত কৃষকের মতোই জীবন-যাপন করেন। তিনি চিশতী সম্প্রদায় আলগজ্জালীর দার্শনিক মতবাদের ব্যাখ্যাকার ছিলেন। তিনি নিরামিষ ভোজন ও অনাড়ম্বর জীবনের জন্যে সকলের শ্রদ্ধা পান। রাজনীতি, ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তিনি দূরে থাকতেন। তিনি হিন্দভী বা হিন্দী ভাষায় তাঁর বাণী প্রচার করায় বহু লোক তার প্রতি আকৃষ্ট হয়।

চিশতী শিল-শিলাহের বিখ্যাত সন্তু ছিলেন খাজা‌ কুতুবউদ্দিন বখতইয়ার কাকী ও তাঁর শিষ্য ফরিদউদ্দিন গঞ্জ-ই-শকর। বখতইয়ার কাকীর ত্যাগময় জীবনের জন্যে তিনি বিরাট প্রসিদ্ধি পান। দিল্লীতে তাঁর খানফায় হিন্দু-মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের লোক আসত। তাঁর শিষ্য ফারিদউদ্দিনের আমলে দিল্লী চিশতী সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফারিদউদ্দিনের প্রভাব পাঞ্জাব ও হান্সি বা হারিয়ানায় বিশেষভাবে ছিল।

চিশতী সম্প্রদায়ের সর্বাধিক বিখ্যাত সন্তু ছিলেন শেখ নিজামুদ্দিন আওলিয়া (১২৮৭-১৩২৫) ও তাঁর শিষ্য শেখ নাসিরুদ্দিন চিরাগ। তাঁরা দিল্লীকেই তাদের প্রধান কর্মকেন্দ্র করেন। গোটা উত্তর ভারতে তাঁর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা জনসাধারণের সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন এবং হিন্দী ভাষায় তাঁদের ধর্মমত ব্যাখ্যা করতেন। নিজামুদ্দিন যোগ সাধনার জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তারা 'সমা' গানের জন্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। নিজামুদ্দিন দিল্লীর সুলতানদের কাছ থেকে দূরে থাকতেন। তিনি ছিলেন অকৃতদার সন্ন্যাসী। তাঁর মধুর ও মানবিক ব্যবহারের জন্যে তাঁর অসাধারণ জনপ্রিয়তা ছিল। দিল্লীর অভিজাতরা তাকে তাদের মুরিদ বা গুরু হিসেবে মান্য করতেন।

বাংলায় চিশতী ভাবধারার প্রসার ঘটান শেখ সিরাজউদ্দিন-আখী-সিরাজ (১৩৫৭ খ্রীঃ)। তিনি গৌড়ে খানকা স্থাপন করেন। বাংলায় তাঁর বিখ্যাত শিষ্য ছিলেন নূর কুতব আলম (১৪১০ খ্রীঃ)। পান্ডুয়াতে তাঁর খানকা ছিল।

চিশতী সম্প্রদায়ের গুরুরা দারিদ্রব্রত ও পবিত্র নৈতিক জীবন-যাপনের ওপর জোর দিতেন। তারা যা দান পেতেন তার দ্বারাই জীবনযাত্রা চালাতেন। অতিরিক্ত অর্থ যা পেতেন দরিদ্রদের তা বিতরণ করতেন। তাঁরা যোগাভ্যাস করতেন এবং অনেকে বছরে ৪০ দিন গুহাতে যোগসাধনা করতেন। তারা "সমা" গানে পারদর্শী ছিলেন।


 2. সুরাবর্দী সিলসিলা:

সুরাবর্দী সিলসিলাহের সুফী সন্তু শেখ বাহাউদ্দিন জ্যাকেরিয়া দ্বাদশ শতকে মূলতানে এক খানকা স্থাপন করেন। আরব দেশে সুরাবর্দী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ শিহাবুদ্দিন সুরাবাদী। ভারতে এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ বাহাউদ্দিন। তিনি এবং ভারতে তাঁর সম্প্রদায়ের অনুগামীরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং ধর্ম-সংক্রান্ত সরকারি পদে যোগ দিতেন। অর্থাৎ শাসক ও অভিজাতদের সঙ্গে তাঁদের যোগ ছিল। স্বয়ং বাহাউদ্দিন নাসিরুদ্দিন কুবাচার বিরুদ্ধে ইলতুৎমিসের পক্ষ নেন। তাঁর পৌত্র রুকন উদ্দিন আবুল ফৎ সুলতান আলাউদ্দিন ও তুঘলক সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা পান।

সুরাবর্দী সিলসিলাহের স্তম্ভ শেখ জালালুদ্দিন তাব্রিজী বাংলাদেশের লখনৌতি ও পাণ্ডুয়ায় খানকা স্থাপন করেন এবং বহু বাঙালী হিন্দুকে ইসলামে দীক্ষিত করেন। পাঞ্জাব, সিন্ধু, মূলতান ও বাংলায় সুরাবর্দী সম্প্রদায়ের সুফীদের প্রভাব বেশী ছিল। তাঁরা ইসলামে ধর্মান্তরকরণের জন্যে উৎসাহ দেখান। সরকারের ওপর তাদের প্রভাব থাকায় বহু হিন্দু এজন্য তাঁদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়।


 3. কাদিরিয়া সিলসিলা:

বাগদাদে মুহিউদ্দীন কাদির জিলানী এই সিলসিলার প্রতিষ্ঠা করেন। শাহ নিয়ামতউল্লা এবং মখদুম মহম্মদ জিলানী সর্বপ্রথম ভারতে এই শাখাটি প্রচার করেন। যদিও মহম্মদ ঘৌসকে ভারতে কাদিরিয়া সিলসিলার প্রবর্তক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এদের প্রধান কেন্দ্র ছিল উচ্ছ। কাদিরিয়া ব্যাপক ভাবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এটি আত্মশুদ্ধির উপর জোর দেয় এবং এদের প্রায়শই সুফিবাদের প্রতি আরও গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বিশেষত্ব- 

  • (i) এটি ইসলামের সর্বপ্রথম রহস্যবাদী সম্প্রদায় ছিল।
  • (ii) মধ্য-এশিয়া এবং আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারের কৃতিত্ব এই সিলসিলার।


 4. নকশবন্দী সিলসিলা:

বাহা-উদ-দীন নকশবন্দ বুখারি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দী সিলসিলাটি নীরব ধ্যান এবং অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার উপর জোর দেওয়ার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল। এটি মুঘল আমলে জনপ্রিয়তা লাভ করে, তবে এর শিকড় সুলতানি যুগে খুঁজে পাওয়া যায়। মুঘল সম্রাট বাবর এবং ঔরঙ্গজেব নকশবন্দী সিলসিলার অনুগামী ছিলেন। বাবর উবায়দুল্লা আহরার এবং ঔরঙ্গজের শেখ মাসুমের শিষ্য ছিলেন। এরা বিশ্বাস করত 

  • (i) এই সিলসিলার মত হল মানুষ এবং ঈশ্বরের মধ্যে সম্পর্কটি প্রেমিক এবং প্রেমিকার নয় দাস এবং প্রভুর।
  • (ii) শরীয়তকে কঠোরভাবে মেনে চলার উপর জোর দেয়।
  • (iii) এই সিলসিলা ছিল সমার (সঙ্গীত) বিরোধী। প্রাণায়াম (যোগ) প্রত্যাখ্যান করেছিল।
  • (iv) ওয়াদত-উল-ওজুদ অর্থাৎ সর্বৈশ্বরবাদের বিরোধীতা করেছিল।
  • (v) ভারতে সর্বপ্রথম তাবলীগের ক্রমবর্ধমান ধর্ম প্রচার) কাজ এই সিলসিলার আহমেদ সিরহিন্দী এবং মীর মাসুম শুরু করেন।


 5. ফিরদৌসি সিলসিলা:

এই সিলসিলা বিহারে প্রচলিত ছিল। ফিরদৌসি সিলসিলার ভারতে প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খাজা বদরউদ্দিন সমরকন্দী। এই সিলসিলার সবচেয়ে বিশিষ্ট সুফি ছিলেন সরফুদ্দিন আহমেদ ইয়াহিয়া মানহেরি। এনার চিঠিগুলি মকতুবাত নামে প্রসিদ্ধ ছিল। মহম্মদ বিন তুঘলক বিহারের মুক্তাকে আদেশ দিয়েছিলেন যে তিনি যেন শেষের জন্য খানকা নির্মাণ করেন। তিনি শেখের প্রার্থনার জন্য একটি মাদুর উপহার দিয়েছিলেন। ফিরোজ তুঘলক সরফুদিন ইয়াহিয়া মানেরিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু ফিরোজ তুঘলকের সময় শেখ সরফুদ্দিন শীঘ্রই নিরাশ হন কারণ ফিরোজ শেখের দুইজন অনুগামী শেখ ইজ্জককুব্ধী এবং শেখ আহমেদ বিহারীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন।


 6. মাদারিয়া এবং ছুরাহিয়া সিলসিলা:

এগুলি আরও সমন্বিত এবং সারগ্রাহী সুফি সিলসিলা ছিল যা হিন্দুধর্মের উপাদানগুলির সাথে সুফি অনুশীলনকে মিশ্রিত করেছিল। তারা প্রায়ই ভারতের বিভিন্ন দর্শকদের কাছে আবেদন করত।

 সুলতানি আমলে সুফি সিলসিলা শুধুমাত্র ইসলামী শিক্ষার প্রসারে নয়, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংহতি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তারা প্রায়শই মুসলিম শাসক অভিজাত এবং ভারতের বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে, ভারতীয় সমাজের সমৃদ্ধ ট্যাপেস্ট্রিতে অবদান রাখে।

Related Short Question:

1. ভারতের কিছু বিশিষ্ট সুফি সাধক কারা?

ভারতের কিছু বিখ্যাত সুফি সাধকের মধ্যে রয়েছে রুমি, মঈনুদ্দিন চিশতি, নিজামুদ্দিন আউলিয়া এবং বাবা ফরিদ।

 2. ভারতে উপস্থিতি আছে এমন কিছু প্রধান সুফি সিলসিলার তালিকা করতে পারেন?

ভারতের প্রধান সুফি আদেশের মধ্যে রয়েছে চিশতী, সোহরাওয়ার্দী, কাদিরি, নকশাবন্দী এবং সুফি আদেশ।

 3. কোন সুফি সিলসিলা ভারতে প্রথম প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করা হয়?

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত চিশতী সিলসিলা ছিল ভারতের প্রথম সুফি সিলসিলা।

 4. দিল্লি সালতানাতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সুফি সাধক কে?

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী দিল্লি সালতানাতের সাথে যুক্ত বিখ্যাত সুফি সাধক।

 5. ভারতে চিশতি সিলসিলা প্রতিষ্ঠার জন্য কে দায়ী ছিলেন এবং এটি কখন উদ্ভূত হয়েছিল?

ভারতে চিশতী সিলসিলা দ্বাদশ শতাব্দীতে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

6. কাশ্মীরের একটি সিলসিলাহর নাম কি?

কাশ্মীরের একটি সিলসিলাহর নাম ঋষি সিলসিলা।

Next Post Previous Post