মহম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্রে কি বৈপরীত্যের সমাহার ঘটেছিল? মহম্মদ বিন তুঘলকে কি পাগলা রাজা বলা যায়?

 মহম্মদ বিন তুঘলক সম্পর্কিত আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতামত ব্যাখ্যা

muhammad-bin-tughluq-modern-historians-views
চরিত্রে বৈপরীত্যের সমাহার, পাগলা রাজা

মধ্যযুগে ভারতের ইতিহাসে কোন শাসকই মহম্মদ বিন তুঘলকের মত এত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়নি। সমসাময়িক ঐতিহাসিক থেকে শুরু করে বর্তমান ঐতিহাসিকরা পর্যন্ত তার চরিত্রের মূল্যায়নে পরস্পর বিরোধী মত প্রকাশ করেছেন। তাই সমসাময়িক ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারণী ও ইবনবতুতা সুলতানের বিভিন্ন গুণের কথা উল্লেখ করলেও তাকে বিধর্মী, নিষ্ঠুর ও রক্ত পিপাসু বলে তার সমালোচনা করেছেন। আধুনিক ঐতিহাসিক এলফিন স্টোন তাঁকে "অল্প বিস্তর পাগল" বলে উল্লেখ করেছেন।ডঃ সমিত মন্তব্য করেছেন যে, সুলতানকে যতটা খারাপ ভাবা হয় ততটা খারাপ তিনি ছিলেন না। তাই বলা যায় আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিকরা তার চরিত্রের মূল্যায়নে দ্বিধা বিভক্ত।

আধুনিক ঐতিহাসিক আর. সি. মজুমদার ভারতীয় বিদ্যাভবন সিরিজের ষষ্ঠ খন্ডে এবং এ. এল. শ্রীবাস্তব তার "The Delhi Sultanate" গ্রন্থে তার চরিত্রে "বৈপরীতের সমাহার" ঘটেছিল বলে মন্তব্য করেছেন। আবার অন্যদিকে ডঃ ঈশ্বরী প্রসাদ, ডঃ মেহেদী হোসেন প্রমুখরা তার সমস্ত দোষ মুক্ত করতে চেয়েছেন। এই অবস্থায় তার চরিত্রের মূল্যায়ন করা অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার।

যাইহোক মহম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্রে বেশ কিছু ভালো গুণও আমরা দেখতে পাই, যেমন তিনি ছিলেন কর্মঠ, উদ্যমসি। তার চরিত্র ছিল উন্নত মানের। মদ্যপান এবং মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। অর্থাৎ তিনি ছিলেন সেই যুগের প্রচলিত দোষ ত্রুটি ঊর্ধ্বে। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তার উদারতা, দানধ্যান, স্নেহপরতা, নম্রতা উল্লেখ করেছেন। তিনি সুলতান হয়েও একজন সাধারণ মানুষের মতো বিচারালয়ে উপস্থিত হয়ে শাস্তি গ্রহণ করতেন। তিনি দরিদ্র ভিক্ষুদের থাকা ও খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন‌ এছাড়়াও তিনি শিক্ষার অনুরাগী ও উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

কিন্তু যে সুলতানের মধ্যে এত ভালো গুণের সমাবেশ দেখা যায় তার মধ্যে আবার খারাপ গুনও লক্ষ্য করা যায়। তার মধ্যে অন্যতম হলো নিষ্ঠুরতা ও খামখেয়ালিপনা। ঐতিহাসিক এলফিন স্টোন প্রথম ঐতিহাসিক যিনি তাকে "অল্প বিস্তর পাগল" আখ্যায় অভিভূত করেন। আর তার এই নিষ্ঠুরতা প্রসঙ্গে বারণী লিখেছেন যে সুলতান অহেতুক নিরপরাধ মুসলমানদের এত বেশি হত্যা করতেন যে তার প্রাসাদের সামনে দিয়ে খিন রক্তের স্রোত বয়ে যেত। বারনেই লিখছেন যে, সুলতান দোয়াব অঞ্চলের কৃষকদের বন্য পশুর নেয় স্বীকার করতেন। এই সকল তথ্যের উপর ভিত্তি করেই অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক সুলতানকে নিষ্ঠুর, দানব, রক্ত পিপাসু বলে উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু আর. সি. মজুমদার, ইবনবতুতার বর্ণনার উপর নির্ভর করে তাকে নিষ্ঠুর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই অবস্থায় আমাদের মনে হয় ঐতিহাসিক শ্রীবাস্তবের মতেই বেশি যুক্তিযুক্ত। তিনি মন্তব্য করেছেন, "It is also incorrect to say that Muhammad delighted in shedding human blood." আসলে তিনি দোষের প্রকারভেদ করতে পারতেন না তাই লঘু দোষে গুরু দন্ড দিতেন।

মহম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্রের অপর একটি ত্রুটি হলো তার খামখেয়ালিপনা ও কল্পনা প্রবণতা। তার রাজধানীর স্থানান্তর, প্রতীকী মুদ্রার প্রচলন প্রভৃতি ছিল খামখেয়ালিপনা ও ধৈর্যহীনতার পরিচয়। তবে পরিকল্পনা গুলি ছিল যুগের তুলনায় বেশি অগ্রণী ও যুক্তিযুক্ত।

মহম্মদ বিন তুঘলক চরিত্রের বিরুদ্ধে অপর অভিযোগ ছিল ধর্মকে না মানা। সমসাময়িক ঐতিহাসিক বারনী ও ইসামী উভয়ই তাকে বিধর্মী বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমরা ইবনবতুতার বর্ণনা থেকে জানতে পারি যে সুলতান প্রত্যহ পাঁচবার নামাজ পড়তেন এবং ইসলামের সমস্ত নিয়ম কানুন কঠোরভাবে মেনে চলতেন। এমনকি যারা মানতেন না তাদের কঠোর শাস্তি পর্যন্ত দিতেন। আসলে তিনি জীবনের প্রথম দিকে নাস্তিক ছিলেন, পরে গড়া মুসলমান হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন।

পরিশেষে বলা যায় মহম্মদ বিন তুঘলক একাধারে ছিলেন প্রজাহিতৈষী, সংস্কারক, দয়ালু, নম্র; আবার অন্যদিকে তার চরিত্রে ধৈর্যহীনতা, খামখেয়ালী, নিষ্ঠুরতা প্রভৃতি গুণের সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। তার চরিত্রের এই পরস্পর বিরোধী গুণের সমাবেশ লক্ষ্য করে 

ডঃ ঈশ্বরী প্রসাদ বলছেন, "One can not escape the conclusion that Muhammad Bin Tughluq was a mixture of opposites."

Related Short Question:

 প্রশ্ন 1: মহম্মদ বিন তুঘলক কে ছিলেন?

 A1: মহম্মদ বিন তুঘলক, যিনি সুলতান মহম্মদ তুঘলক নামেও পরিচিত, তিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতে দিল্লি সালতানাতের একজন শাসক যিনি ১৩২৫ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।

 প্রশ্ন 2: মহম্মদ বিন তুঘলকের কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন কি ছিল?

 A2: মহম্মদ বিন তুঘলক একটি প্রতীকী মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করেন এবং সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলি ভারতের দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে প্রসারিত করেন।

 প্রশ্ন 3: মহম্মদ বিন তুঘলক কেন রাজধানী স্থানান্তরের জন্য পরিচিত?

 A3: তিনি দিল্লী সালতানাতের রাজধানী দিল্লী থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তর করার প্রচেষ্টার জন্য বিখ্যাত, যেটি একটি চ্যালেঞ্জিং এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিল।

প্রশ্ন 4: মহম্মদ বিন তুঘলকের কিছু প্রশাসনিক সংস্কার কি ছিল?

 A4: তিনি একটি ডাক ব্যবস্থা, উন্নত কর ব্যবস্থা এবং একটি কেন্দ্রীভূত কৃষি বিভাগের মতো প্রশাসনিক সংস্কার প্রবর্তন করেন।

 প্রশ্ন 5: মহম্মদ বিন তুঘলক কি তার শাসনামলে বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন?

A5: হ্যাঁ, তার শাসনামল অসংখ্য বিদ্রোহ এবং বিদ্রোহ দ্বারা চিহ্নিত ছিল, আংশিকভাবে ভারী কর আরোপ এবং মূলধন স্থানান্তরের কারণে।

 প্রশ্ন 6: মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্ব অর্থনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল?

A6: তার উচ্চাভিলাষী নীতি, যেমন তামার মুদ্রা প্রবর্তন, মিশ্র অর্থনৈতিক পরিণতি করেছিল, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অসুবিধা হয়েছিল।

 প্রশ্ন 7: দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের তার প্রচেষ্টার ফলাফল কী ছিল?

 A7: রাজধানী স্থানান্তর জনগণের জন্য অপরিসীম দুর্ভোগের কারণ হয়েছিল এবং অবশেষে লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ এবং সম্পদের অভাবের কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল।

 প্রশ্ন 8: ভারতীয় ইতিহাসে মহম্মদ বিন তুঘলকের উত্তরাধিকার কি?

A8: ভারতীয় ইতিহাসে তাকে একটি জটিল ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করা হয়, যা তার দূরদর্শী ধারণা এবং তার নীতির কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ ও দুর্ভোগের জন্য পরিচিত।

 প্রশ্ন 9: কিভাবে মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বের অবসান ঘটে?

 A9: ১৩৫১ সালে তার রহস্যময় অন্তর্ধানের মাধ্যমে তার রাজত্বের সমাপ্তি ঘটে এবং তার চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক তার স্থলাভিষিক্ত হন।

 প্রশ্ন 10: মহম্মদ বিন তুঘলকের সাথে সম্পর্কিত কোন ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে কি?

 A10: হ্যাঁ, মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির বিশাল তুঘলকাবাদ দুর্গ নির্মাণের সাথে জড়িত, যা আজও একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে রয়ে গেছে।

Next Post Previous Post