দিল্লির প্রথম সুলতানী শাসন কে দাস বংশ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

 দিল্লি সুলতানী দাসবংশ বিতর্ক

দিল্লি সুলতানী দাসবংশ বিতর্ক
দিল্লি সুলতানী দাসবংশ বিতর্ক

নিঃসন্তান মহম্মদ ঘুরীর মৃত্যু হলে গজনী সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তার বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবুদ্দিন আইবক ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সুলতান উপাধি গ্রহণ করেন। তার সিংহাসন আরোহণের পর থেকেই দিল্লিতে স্বাধীন সুলতানী শাসনের সূচনা হয়েছিল।


ঐতিহাসিক এলফিন স্টোন, ডঃ স্মিথ প্রমুখ কুতুব উদ্দিন আইবকের প্রতিষ্ঠিত রাজবংশকে "দাস বংশ" বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে দিল্লিতে যে তিনটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল

দিল্লি সুলতানী দাসবংশ

১। 👉 কুতবি
২। 👉 সামসি
৩। 👉 বলবনি

তাদের প্রতিষ্ঠাতা যথাক্রমে কুতুবউদ্দিন আইবক ইলতুৎমিস ও গিয়াসউদ্দিন বলবন জীবনের একটি পর্বে দাস ছিলেন। তাই তাদের প্রতিষ্ঠিত বংশ দাস বংশ নামে পরিচিত। তারা আরো বলেন ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে কায়কোবাদের (মতান্তরে কায়ুমাসের) মৃত্যুর পর দিল্লিতে দাস বংশের অবসান হয় এবং শুরু হয় খলজি যুগ।


কিন্তু উপরোক্ত ও মতের বিরোধিতা করেছেন রিজভী, আহমেদ নিজামী প্রমুখ ঐতিহাসিক। তারা তাদের বক্তব্যের সমর্থনে যে সকল যুক্তিগুলি দেখিয়েছেন সেগুলি হল

প্রথমতঃ ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লিতে একটি নয় তিনটি রাজবংশ শাসন করত। এই তিনটি বংশর পূর্বপুরুষ এক ব্যক্তি ছিলেন না।

দ্বিতীয়তঃ এই তিনটি বংশের প্রতিষ্ঠাতা জীবনের একটি পর্যায়ে দাস ছিলেন, সারা জীবন নয়।

তৃতীয়তঃ এই তিনজন প্রতিষ্ঠতাই জন্মসূত্রে অভিজাত বংশের সন্তান ছিলেন। ভাগ্যচক্রে তারা ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল।

চতুর্থতঃ এই তিন বংশের প্রতিষ্ঠতারা পরবর্তীকালে ক্রীতদাসত্ত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে নিজে প্রভুদের বংশের সাথে বৈবাহিক সুত্রে আবদ্ধ হয় এবং শাসন ব্যবস্থার উচ্চপদ লাভ করে।

পঞ্চমতঃ এই তিনজন প্রতিষ্ঠাতাই ক্রীতদাস হিসেবে সিংহাসনে বসেনি। সিংহাসন লাভের পূর্বে দাসত্ব থেকে মুক্তি ঘটিয়ে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সিংহাসনে বসেন।

ষষ্ঠতঃ এই তিন বংশের প্রতিষ্ঠাতারা প্রথম জীবনে দাস হলেও তাদের বংশধররা ছিলেন স্বাধীন নাগরিক।


উপরিক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাল পর্বকে দাস বংশ বলা যুক্তিসম্মত নয়। তাই ঐতিহাসিক রিজভী এই পর্বের সুলতানদের দাসবংশীয় সুলতান না বলে "মামেলুক সুলতান" বলেন। আবার অনেক ঐতিহাসিক এই পর্বের দিল্লি সুলতানদের ইলবাড়ি সুলতান বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এই পর্বের সুলতানদের মধ্যে কুতুবুদ্দিন আইবক ও আরামশাহ ইলবাড়ি গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন না। তাই এই নামকরণও যুক্তির সম্মত নয়। সবদিক বিবেচনা করে ডক্টর আহমেদ নিজামী এই পর্ব কে "Early Turkish Sultan" বলে অভিহিত করেছেন।

Related Short Question:

প্রশ্ন 1: দিল্লি সালতানাত দাসত্ব বিতর্ক কি?

 A1: দিল্লী সালতানাতের দাসত্ব বিতর্কটি দিল্লী সালতানাতের প্রথম দিকের শাসকরা দাস করা ব্যক্তি ছিল কিনা তা ঘিরে বিতর্ককে বোঝায়।

 প্রশ্ন 2: প্রশ্নে দিল্লি সালতানাতের শাসক কারা ছিলেন?

 A2: বিতর্কটি প্রাথমিকভাবে দিল্লি সালতানাতের প্রথম কয়েকজন শাসককে কেন্দ্র করে, যার মধ্যে কুতুবুদ্দিন আইবক এবং তার উত্তরসূরিরা রয়েছে।

 প্রশ্ন 3: কেন তাদের "দাস রাজবংশ" বলা হয়?

 A3: তাদের "দাস রাজবংশ" বলা হয় কারণ কিছু ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন যে এই শাসকরা মূলত দাসত্ব করা ব্যক্তি যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন।

 প্রশ্ন 4: কোন প্রমাণ এই ধারণাটিকে সমর্থন করে যে তারা ক্রীতদাস ছিল?

 A4: ঐতিহাসিক বিবরণগুলি উল্লেখ করে যে এই শাসকদের মধ্যে কিছু সিংহাসনে আরোহণের আগে প্রাথমিকভাবে ক্রীতদাস বা সৈনিক হিসাবে দাসত্ব করা হয়েছিল।

 প্রশ্ন 5: এই বিতর্কে বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি কী?

 A5: বিরোধীরা যুক্তি দেয় যে "দাস রাজবংশ" শব্দটি একটি ভুল নাম এবং এই শাসকরা ক্রীতদাস ছিলেন না কিন্তু দক্ষ সামরিক কমান্ডার এবং প্রশাসক ছিলেন।

 প্রশ্ন 6: এই বিতর্কের তাৎপর্য কি?

 A6: বিতর্কটি সেই সময়ের জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিশীলতার উপর আলোকপাত করে এবং ঐতিহাসিক বর্ণনাকে চ্যালেঞ্জ করে।

 প্রশ্ন 7: ঐতিহাসিকদের মধ্যে ঐক্যমত কি?

 A7: ঐতিহাসিকরা বিভক্ত;  কেউ কেউ "দাস রাজবংশ" তকমা গ্রহণ করে, অন্যরা এই শাসকদের উত্সের জন্য বিকল্প ব্যাখ্যা পছন্দ করে।

 প্রশ্ন 8: এই বিতর্ক কীভাবে দিল্লির ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের বোঝার উপর প্রভাব ফেলে?

 A8: এটি দিল্লি সালতানাতের সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো এবং মধ্যযুগীয় ভারতে শাসকরা কীভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল তার গভীর পরীক্ষাকে উত্সাহিত করে।

 প্রশ্ন 9: এই বিষয়ে চলমান গবেষণা এবং আলোচনা আছে?

 A9: হ্যাঁ, পণ্ডিতরা এই বিষয়টিকে অন্বেষণ করে চলেছেন, ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং দৃষ্টিভঙ্গিগুলির পুনর্মূল্যায়ন করে একটি পরিষ্কার বোঝার জন্য।

Next Post Previous Post