আমেরিকার সমৃদ্ধির একশ বছর - ঐতিহাসিক গল্প

 আমেরিকার সমৃদ্ধির একশ বছর

আমেরিকার সমৃদ্ধির একশ বছর
আমেরিকার সমৃদ্ধির একশ বছর

আমেরিকান গৃহযুদ্ধে দক্ষিণের ওপরে উত্তরের পরাজয় ইউনিয়নকে রক্ষা করে। তবে যুদ্ধের পরে দেশের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। দক্ষিণী রাজ্যগুলোর শহর, গ্রাম, প্ল্যান্টেশন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় কোন রকম সংস্কার কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। আরো দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল, গৃহযুদ্ধের সময় দক্ষিণ থেকে পালিয়ে যাওয়া চল্লিশ লক্ষ নিগ্রো ক্রীতদাস যুদ্ধ শেষে আবার আগের জায়গায় ফিরে গেলে তাদের জন্যে বাড়িঘর নির্মাণ, আহার, পোশাক- পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা, শিক্ষা এবং কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কাজেই উত্তরের ওপর দক্ষিণকে নির্ভর করতে হচ্ছিল।

Two American brothers Orville and Wilbur Wright flew the first airplane.
দুই আমেরিকান ভাই অরভিল ও উইলবার রাইট প্রথম আকাশে বিমান চালান।

আব্রাহাম লিংকন বেঁচে থাকলে দক্ষিণের প্রতি সহানুভূতি জানাতেন এবং কোন রকম প্রশ্ন না তুলে অসহায়, নিপীড়িত মানুষগুলোকে সাহায্য করতেন। তার উত্তরসুরি অ্যান্ড্রু জ্যাকসন (১৮০৮-৭৫) লিংকনের ক্ষতিপূরণ নীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু একদল শক্তিশালী, বর্ণবিদ্বেষী রিপাবলিকান তার এ কাজে ৰাধা সৃষ্টি করে। তারা বলে দক্ষিণী রাজ্যগুলোকে লড়াইয়ের মাধ্যমে জয় করা হয়েছে কাজেই তাদেরকে এভাবেই শাসন করা উচিত। দক্ষিণের সামরিক সরকারকে উত্তর দক্ষিণের ঘৃণা আর তিক্ততার মাঝ দিয়ে চলতে হচ্ছিল। তবে দক্ষিণে একদল ব্যবসায়ী এসে খামার ও প্ল্যান্টেশনগুলো জোর করে কিনতে শুরু করে। এগুলোর মালিকরা শ্রমিকদের প্রায় অনাহারে রাখত এবং তাদের পক্ষে যারা খামার দেখাশোনা করত তারা শ্রমিকদের সাথে অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করত। এই একই কাজ একশ বছর আগে ইংরেজরা করেছে আয়ারল্যাণ্ড ও ওয়েলসে। 

১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি জেনারেল ইউলিসিস এস গ্রান্ট (১৮২২-৮৫)। এই বিখ্যাত সৈনিকটি গৃহযুদ্ধের শেষ ক'মাসে উত্তরের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দিয়েছিলেন এবং অ্যাপোম্যাটেক্সে তার কাছেই দক্ষিণী বাহিনীর প্রধান জেনারেল লী আত্মসমর্পণ করেন।

Three famous war leaders, at the Yanta Conference in 1945, are, from left, Churchill, President Roosevelt and Marshal Stalin.
তিন বিখ্যাত যুদ্ধ নেতা, ১৯৪৫-এ ইয়ান্টা সম্মেলনে, বামদিক থেকে চার্চিল, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও মার্শাল স্ট্যালিন।

তিন বিখ্যাত যুদ্ধ নেতা, ১৯৪৫-এ ইয়ান্টা সম্মেলনে

নেতার নাম দেশ ও পদবি
চার্চিল ইংল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী
রুজভেল্ট মার্কিন রাষ্ট্রপতি
মার্শাল স্ট্যালিন সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি

গৃহযুদ্ধের পরে আমেরিকানরা তাদের দরজা খুলে দেয় ইউরোপীয় অভিবাসীদের জন্যে। ১৮৪৫-৮ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সইতে না পেরে প্রথম আইরিশরা তাদের দেশ ত্যাগ করে আমেরিকার দিকে পা বাড়ালে অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ১৮৪৮-এর বিপ্লবের পরে অনেক ইউরোপীয় তাদের দেশ ত্যাগ করেছে। আমেরিকানরা কর্মঠ, পরিশ্রমী, ইউরোপীয় কারিগরদেরকে স্বাগত জানায়। কারণ তখন তারা একটি নিউ ওয়ার্ল্ড বা নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখছিল।

একই সময় পশ্চিমে বসবাস শুরু হয়ে যায়। মালভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় মজুররা সাফসুতরো করে বসতি স্থাপন করে ও নতুন রাজ্য স্থাপন করে। কোন কোন অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে আদিবাসী ইণ্ডিয়ানদেরকে তাদের শত জনমের নিবাস থেকে উৎখাত করা হয়।

আমেরিকায় রাজ্য বিস্তারের এ সময় যে শিল্প বিপ্লবের জোয়ার শুরু হয় তা গ্রেট ব্রিটেনেরও কল্পনার বাইরে ছিল। আমেরিকান বিজ্ঞান ও আবিষ্কার দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। গোটা দেশ জুড়ে বিরাট রেলওয়ে নেটওয়ার্ক স্থাপিত হয়, খনন করা হয় খাল, দূর দূরান্তে নির্মাণ করা হয় রাস্তাঘাট এবং অসংখ্য শহর প্রতিষ্ঠিত হয়। আবিষ্কার হয় তেল এবং টেক্সাস থেকে প্রচুর পরিমাণে তেল উত্তোলন করা হয়, আর অন্যান্য রাজ্যগুলো যন্ত্রবিদ্যায় এগিয়ে যায় অনেক দূর। অর্ধ শতকের মধ্যে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণে কলকারখানা গড়ে ওঠে।

শিল্পায়নে ব্যাপক উন্নতির পাশাপাশি আমেরিকা বিদেশ নীতিতেও ভূমিকা রাখতে শুরু করে। আমেরিকানরা ওয়েস্ট ইণ্ডিজে ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। প্রয়োজনে যুদ্ধের হুমকি দিলে ব্রিটিশরা ওখান থেকে চলে যায়। শতকের শেষ নাগাদ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হতে থাকে আমেরিকা। ১৮৯৫ তে কিউবায় স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। স্পেনিয়ার্ডরা তাদের বিরাট সেনাবাহিনী দিয়েও এ বিপ্লব দমন করতে পারছিল না। ওই সময় হাভানা বন্দরে আমেরিকান ক্রুজার মেরিনে অকস্মাৎ বিদ্রোহীরা হামলা চালিয়ে (ফেব্রুয়ারি ১৮৯৮) আড়াইশোরও বেশি ক্রুকে হত্যা করে। আমেরিকানরা প্রতিশোধ নেয় স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যদিও এ হামলার জন্যে স্পেনিয়ার্ডরা কোনভাবেই দায়ী ছিল না। যুদ্ধে স্প্যানিশ ফোর্স সব জায়গায় হারতে থাকে এবং যুদ্ধ শেষে তাদেরকে হারাতে হয় কিউবা, পুয়ের্তোরিকো এবং ফিলিপাইনও।

বিংশ শতকে আমেরিকা বিশ্বের সেরা দেশ হিসেবে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায়। এ শতকের প্রথম ভাগে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের ইচ্ছা আমেরিকার ছিল না। কিন্তু জার্মানরা আমেরিকান জাহাজের ওপর একের পর এক হামলা চালিয়ে ক্রুদ্ধ করে তোলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে। তিনি ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল তারিখে কংগ্রেসকে অনুরোধ জামান যুদ্ধ ঘোষণার জন্যে ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা বিজয় লাভ করলেও অন্যান্য দেশের মত তারও কম আর্থিক ক্ষতি হয়নি। আমেরিকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে দারুণ মন্দাভাব দেখা দেয় এবং ১৯২৯-এ নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ দারুণভাবে ধসে পড়ে। শেয়ার মূল্য মারাত্মকভাবে পড়ে গেলে লাখ লাখ মানুষ রাতারাতি কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। দেশ জুড়ে বিরাজ করে চরম অর্থনৈতিক মন্দা।

আমেরিকানদেরকে এ আর্থিক দুরবস্থা থেকে উঠে আসতে সাহায্য করেন ডেমোক্রেটিক দলের ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (১৮৮২-১৯৪৫)। রুজভেল্ট ছিলেন একজন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ, ৩৯ বছরে তিনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হলে জীবনের বাকি সময়টা তাকে কাটিয়ে দিতে হয় হুইল চেয়ারে বসে। এ ছাড়া তার স্বাস্থ্য ভালই ছিল।

রুজভেন্টের নির্বাচনী প্রচারণা আমেরিকান জনগণকে 'নিউ ডিল'-এর স্বপ্ন দেখায়। তিনি শ্রুতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় যেতে পারলে আমেরিকাকে আবার ধনী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবেন। শিল্প কারখানার বিস্তার ঘটবে, সকল শ্রেণীর মানুষের জীবনে আসবে সমৃদ্ধি। জনগণ তার কথায় বিশ্বাস করে তাকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। তিনি ক্ষমতায় বসে রাজ্যগুলোতে ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং প্রেসিডেন্সিয়াল অফিসের মর্যাদা উন্নীত করেন। কখনো কখনো স্বৈরাচারীর মত আচরণ করলেও রুজভেল্টকে তার অনুসারীরা সবসময় সমর্থন করে গেছেন। ফলে ১৯৩৬-এ আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনের ইতিহাসে সর্বাধিক ভোট পেয়ে তিনি আবার জয়যুক্ত হন। বিদেশ নীতিতে রুজভেল্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা নিরপেক্ষ ছিল, কিন্তু ১৯৪০-এর জুনে জার্মানদের কাছে ফ্রান্সের পতন ঘটলে রুজভেল্ট সমবেদনা জানাতে দ্বিধা করেন নি। তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনষ্টন চার্চিলের সঙ্গে অন্নসহ অন্যান্য রসদ সাহায্যের চুক্তি করেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটেনের পতন ঘটলে নাৎসী জার্মানী আমেরিকার দিকে নজর দিতে পারে। ১৯৪০-এ তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ইতিহাসে রুজভেল্টই একমাত্র ব্যক্তি যাকে পরপর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়েছিল।

১৯৪১-এর ৭ ডিসেম্বরে জাপানীরা, যারা ইতিমধ্যে দখল করে নিয়েছিল চীন- এবং দূর প্রাচ্যে ব্রিটিশ ও আমেরিকান উপনিবেশ উপর্যুপুরি হামলা চালিয়েছে, তারা আকস্মাৎ আক্রমণ করে বসে হাওয়াইর পার্ল হারবার বন্দর। তাদের বিদ্যুৎগতি আক্রমণে পাঁচটি আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজ ডুবে যায়।

বিশ্বখ্যাত সাত নেতা

নেতা পদবি কর্মক্ষেত্র
জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত
নিকিতা ক্রুশ্চেভ রাশান কমুউনিষ্ট পার্টির ফার্ট সেক্রেটারি রাশিয়ান পলিটিক্স
ফিডেল কাট্টো কিউবার প্রধানমন্ত্রী কিউবান রেভোলিউশন
হ্যারল্ড ম্যাকমিলান ব্রিটেনের প্রধান মন্ত্রী ব্রিটিশ রাজনীতি
জেনারেল চার্লস দ্য গল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফরাসি সেনাবাহিনী
মার্টিন লুথার কিং আমেরিকান সিভি রাইটস মুভমেন্টের নেতা সামাজিক ন্যায়
কনরাড আভেনার জার্মান ফেডারেল রিপাবলিকের চ্যাপেলর জার্মান রাজনীতি

আমেরিকানদের জন্যে এটা ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, তবে ধাক্কা সামলে ওঠার পরে তারা জাপানী, জার্মানী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধের শেষের দিকে রুজভেন্টের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছিল। তবু তিনি মি বাহিনীর সাথে ইয়ান্টা সম্মেলনে বসেছিলেন। তিনি ১৯৪৫-এর এপ্রিলে মারা যান ১৯৪৪-এর শেষ নাগাদ তাকে চতুর্থ বারের মত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত কর হয়েছিল। তার মৃত্যুর পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পদ অলংকৃত করে ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারী এস. ট্রুম্যান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুদ্ধ বিশ্বস্ত ইউরোপকে জেনারেল মার্শালের বিখ্যাত 'মার্শাল প্ল্যান' অনুযায়ী ১০,০০০,০০০,০০০ ডলার অর্থ সাহায্য দেয়া হয় দেশগুলোকে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবার জন্যে। তারপর থেকে আমেরিকা বিভিন্ন দেশকে অর্থ সাহায্য দেয়া অব্যাহত রেখেছে। তার পারমাণবিক অস্ত্র বিশ্ব শাস্তি রক্ষা করতে সমর্থ হলেও আমেরিকা কোরিয়া (১৯৫০-৫৩) ও ভিয়েতনামের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পরে আমেরিকা পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি । গত একশ বছরে আমেরিকা হয়ে উঠেছে পৃথিবীর অভিভাবক। অন্ততঃ নিজেকে সে তাই মনে করে। অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এ দেশটির বর্তমান দণ্ডমুন্ডের কর্তা জর্জ ওয়াকার বুশ। তিনি ইরাকে অন্যায়ভাবে হামলা চালিয়ে সে দেশের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত ও বন্দী করেছেন। বর্তমানে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন ইরান, জর্ডানসহ আরো কয়েকটি মুসলিম দেশকে। বুশ যাকে পথের কাঁটা মনে করছেন, সরিয়ে দিচ্ছেন তাকে। ২০০৪ সালে দ্বিতীয়বারের মত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পরে তিনি যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। যদিও আমেরিকা একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু সে দেশটির কর্ণধারের কিছু কিছু কাজে অগণতান্ত্রিক মনোভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়।

Source: The History of the World

Next Post Previous Post