পাল আমলে বাংলার সাহিত্যের বিকাশ আলোচনা কর।

 পাল রাজবংশের সময় বাংলা সাহিত্য

পাল রাজবংশের সময় বাংলা সাহিত্য
পাল রাজবংশের সময় বাংলা সাহিত্য

পাল রাজবংশের সময় বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। পাল শাসকরা বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশের কিছু অংশ অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে শাসন করেছিল। তাদের শাসন আমল বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সময় ছিল। এই সময়ে বাংলা সাহিত্যের বিকাশের কিছু মূল বিষয় এখানে দেওয়া হল আলোচনার জন্য:

 1. সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক:

পাল শাসকরা সাহিত্য, শিল্প এবং শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তারা বাংলার মতো সংস্কৃত ও আঞ্চলিক উভয় ভাষার বিকাশকে উৎসাহিত করেছিল। পূর্বভারতে কথ্য সংস্কৃত বা প্রাকৃতের যে-রূপটি প্রচলিত ছিল তার নাম ছিল মাগধী প্রাকৃত। এই প্রাকৃতই লোকায়ত স্তরে অপভ্রংশর পর্ব পেরিয়ে গৌড়-বঙ্গীয় ভাষা রূপে বিবর্তিত হয়। সংস্কৃত ও মাগধী প্রাকৃতের গৌড়-বঙ্গীয় বিশিষ্ট রূপ ছাড়া, পাশাপাশি আর একটি ভাষা প্রচলিত ছিল। তা হলো শৌরসেনী অপভ্রংশ। উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে পূর্ব-ভারত পর্যন্ত এর ব্যাপক বিস্তার ছিল।

 2. সংস্কৃত প্রভাব:

আলোচ্য আমলে সংস্কৃত ছিল সাহিত্যের ভাষা। সাহিত্যের বেশিরভাগ অংশ সংস্কৃতে রচিত হয়েছিল। যা ছিল পাণ্ডিত্য এবং অভিজাতদের ভাষা। নানা কাব্যগ্রন্থ ও শাস্ত্রীয় রচনার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে এই ভাষা ছিল বেশিরভাগ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। পাল আমলে সংস্কৃত গ্রন্থগুলি বাংলায় অধ্যয়ন এবং পুনরুত্পাদন করা হয়েছিল। যার ফলে প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান সংরক্ষণ করা গিয়েছিল।

 3. বাংলা ভাষার উদ্ভব:

যখন সংস্কৃত বিশিষ্ট জনের ভাষা ছিল তখন পাল যুগে বাংলা একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য ভাষা হিসাবে আবির্ভূত হতে শুরু করে। এটি প্রাকৃত (আধুনিক বাংলার অগ্রদূত) থেকে আরও পরিমার্জিত সাহিত্যের রূপের দিকে ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রাকৃত ভাষার বৈয়াকরণিকরা অঞ্চলভেদে প্রাকৃতের পাঁচটি স্তর বা পর্যায় ভাগ করেছেন। যথা : পৈশাচী, মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনী, মাগধী ও অর্ধ- মাগধী।

মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত < অপভ্রংশ থেকে মারাঠী, এবং মাগধী প্রাকৃত < অপভ্রংশ থেকে পূর্বাঞ্চলের বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া, মৈথিলী, মগহী, ভোজপুরীর উৎপত্তি।

 4. সংস্কৃতে মহৎ রচনাকার:

আচার্য ধর্মপালের মতো বিশিষ্ট পণ্ডিতগণ সংস্কৃতে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। ধর্মপাল, উদাহরণ স্বরূপ, চন্দ্রকীর্তীর "প্রসন্নপদ" এর একটি ভাষ্য "চন্দ্রদীপ" লিখেছিলেন, যা একটি উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ দার্শনিক পাঠ ছিল। এছাড়াও কবি গৌড় অভিনন্দ, রামচরিত প্রণেতা সন্ধ্যাকর নন্দী, চণ্ডকৌশিক প্রণেতা ক্ষেমীশ্বর, দর্ভপাণি, কীচকবর্ণ প্রণেতা নীতিবর্মা, নৈষধচরিত রচয়িতা শ্রীহর্ষ থেকে পবনদূত কাব্য রচয়িতা ধোয়ী, উমাপতিধর, গোবর্ধন, শরণ এবং গীতগোবিন্দ রচয়িতা জয়দেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসময় ভবদেবভট্ট, জীমূতবাহন, অনিরুদ্ধ, জ্ঞানবিষ্ণু, শূলপাণি, সর্বানন্দ প্রমুখ স্মৃতিশাস্ত্র রচয়িতারূপে বিশেষ খ্যাতিলাভ করেন।

 5. আদি বাংলা ভাষার রচনা:

সাহিত্যের ক্ষেত্রে পাল আমলের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বাংলা ভাষার উদ্ভব। এই গৌড়-বঙ্গীয় বা আদি বাংলা ভাষার নিদর্শন হলো "চর্যাপদ" একটি রহস্যময় কবিতার সংকলন এবং "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন" একটি ভক্তিমূলক গান। এই গ্রন্থগুলি বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। চর্যাগীতি-গুলিরচনা করেছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। এধরনেরই চারটি পুঁথি নেপাল থেকে উদ্ধার করেন আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, চর্যাগীতির ভাষা 'প্রাচীনতম বাংলা ভাষার লক্ষ্মণাক্রান্ত'। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত প্রথম পুঁথিটিতে বিভিন্ন পদকর্তা রচিত সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ বা গান ছিল, যার নাম চর্যাচর্যবিনিশ্চয়। সাধারণভাবে যা চর্যাপদ নামে সুপরিচিত। অন্য দু'টি পুঁথি হলো সরহপাদ ও কাহ্নপাদের দোহা, চতুর্থটি হল ডাকার্ণব দোহা। প্রথমটি ছাড়া তিনটিই অবহট্‌ঠভাষায় লেখা। এই চর্যাপদগুলিতে বজ্রযান, সহজযান প্রভৃতি বৌদ্ধধর্ম সম্প্রদায়ের তত্ত্ব-সীমার কথা নানাভাবে বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই চর্যাপদের পদকর্তা সিদ্ধাচার্যদের সকলের। চৌরাশি সিদ্ধের তালিকায় পাওয়া যায়।

 6. সাহিত্যিক ধরন:

পাল যুগে কবিতা, গদ্য এবং ধর্মীয় গ্রন্থ সহ বিভিন্ন সাহিত্যিক রূপের বিকাশ ঘটেছে। এই কাজগুলিতে প্রায়শই বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম এবং বাংলার আদিবাসী ঐতিহ্যের বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত ছিল। পূর্বাঞ্চলের মানুষদের 'অন্ত্যজ' বলে মনে করা হতো। তাই মাগধী প্রাকৃতকে বলা হতো অন্ত্যজদের ভাষা। পাল যুগে বাংলায় সংস্কৃত চর্চার প্রাবল্যও দেখা যায়। সাহিত্য ছাড়াও ধর্ম, দর্শন, ব্যাকরণ, অলংকার, ব্যবহার, চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ে সংস্কৃতভাষায় নানা গ্রন্থ রচিত হয়।

 7. বৌদ্ধধর্মের প্রভাব:

এই যুগের সাহিত্যে বৌদ্ধধর্মের গভীর প্রভাব ছিল এবং অনেক গ্রন্থ বৌদ্ধ আদর্শ ও দর্শনকে প্রচার করেছে। পাল আমলে বৌদ্ধধর্মে মহাযানপন্থী সিদ্ধাচার্যদের আবির্ভাব ঘটে। এঁদের মধ্যে লুইপাদ, কাহ্নপাদ, সরহপাদ, শবরপাদ প্রমুখ ছিলেন প্রধান। এই সিদ্ধাচার্যরাই বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ চর্যাপদগুলি রচনা করেন।

 8. পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের উপর প্রভাব: 

পাল যুগে সাহিত্যের বিকাশ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। আঞ্চলিক বাংলার ব্যবহার এবং এই সময়ের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজও বাংলা সাহিত্যকে গঠন করে চলেছে।

 সামগ্রিকভাবে, পাল রাজবংশ বাংলা সাহিত্যের প্রাথমিক বীজ লালন-পালনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যা পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে এর ক্রমাগত বৃদ্ধি ও বিবর্তনের মঞ্চ তৈরি করে।

Related Short Question:

 প্রশ্ন 1: বাংলা সাহিত্যে পাল রাজবংশের তাৎপর্য কী?

 A1: পাল রাজবংশ প্রাথমিক বাংলা সাহিত্যের লালনপালনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য ভাষা হিসাবে বাংলার উত্থানকে উৎসাহিত করেছিল।

 প্রশ্ন 2: পাল যুগে সাহিত্যে কোন ভাষাগুলি বিশিষ্ট ছিল?

 A2: পাল যুগে, সংস্কৃত এবং বাংলা উভয়ই সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, সংস্কৃত ছিল পাণ্ডিত্যের ভাষা এবং বাংলা ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য ভাষা হিসাবে আবির্ভূত হয়।

 প্রশ্ন 3: বাংলা সাহিত্যে পাল যুগের উল্লেখযোগ্য কিছু রচনার নাম বলতে পারবেন?

 A3: অবশ্যই! "চর্যাপদ" এবং "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন" এই যুগের দুটি উল্লেখযোগ্য রচনা। "চর্যাপদ" রহস্যময় কবিতার সংকলন এবং "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন" একটি ভক্তিমূলক গান।

 প্রশ্ন 4: পাল রাজবংশের সময় বৌদ্ধধর্ম বাংলা সাহিত্যে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল?

 A4: এই সময়কালে বৌদ্ধধর্মের সাহিত্যের উপর গভীর প্রভাব ছিল, অনেক গ্রন্থে বৌদ্ধ আদর্শ এবং দর্শন প্রচার করা হয়েছে, প্রায়শই আদিবাসী বাঙালি ঐতিহ্যের সাথে মিলিত হয়।

 প্রশ্ন 5: পাল রাজবংশের উত্তরাধিকার আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

 A5: পাল রাজবংশের সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি সাহিত্যিক ভাষা হিসাবে বাংলার ব্যবহার আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করে, এর সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্যকে গঠন করে।

Next Post Previous Post