প্রাক ইতিহাস মানুষের জীবনধারা লেখো।

 প্রাক-ইতিহাস: প্রাচীন মানুষের রহস্যময় জীবনধারা

প্রাচীন মানুষের রহস্যময় জীবনধারা
#প্রাক_ইতিহাস #প্রাচীন_ইতিহাস #প্রাচীন_সভ্যতা 

প্রাক-ইতিহাস মানুষের জীবনধারা বর্ননা করতে গিয়ে আমরা দেখি শিকারী-সংগ্রাহক হিসাবে তাদের মর্যাদার লড়াই এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর তাদের নির্ভরতাশীলতা। এবিষয়ে এখানে কিছু মূল আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে যা তাদের জীবনধারাকে চিহ্নিত করে:

 1. শিকারী-সংগ্রাহক যাযাবর: 

প্রাক-ঐতিহাসিক সমাজগুলি মূলত যাযাবর ছিল। তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে স্থানান্তরিত প্রাণী শিকার করত। এই সকল মানুষরা খাদ্যের জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভর করে থাকত। তাই মৌসুমী উদ্ভিদের বৃদ্ধির মতো খাদ্য উৎস অনুসরণ করতে করতে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেত। তাদের নির্দিষ্ট কোন বাসভূমি ছিল না। খাদ্যের সন্ধানে তাদের এই ঘুরে বেড়ানোর কারণে তাদের যাযাবর বলা হত।

 2. জীবিকা নির্বাহের কৌশল: 

তাদের ভরণ-পোষণের প্রাথমিক উপায় ছিল মাংসের জন্য বন্য প্রাণী শিকার করা এবং ভোজ্য গাছপালা, ফল, বাদাম এবং শিকড় সংগ্রহ করা। তারা তাদের আশেপাশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করত। যখন কোনো এক জায়গার এই প্রাকৃতিক সম্পদ শেষ হয়ে যেত তখন তারা অন্য স্থানে সম্পদের সন্ধানে চলে যেত।

 3. সরল আশ্রয়: 

প্রাক-ঐতিহাসিক লোকেরা বনে জঙ্গলে বসবাস করত। তাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলি ছিল অস্থায়ী। প্রথম দিকে তারা গাছের ডালপালায় বাস করত। তারপর তারা গুহা ও ঝুলতে থাকা শিলার উপর থাকতে শুরু করে। তবে গুহাগুলির খুব একটা ভিতরে তারা থাকত না, গুহার অগ্রভাগেই বাস করত।  যখন তারা খাদ্যের সন্ধানে অন্য জায়গায় যেত তখন তারা বড় বড় গাছের পাতা, লাঠি ও পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি তাবু তৈরি করে জঙ্গলে থাকত। এখানে লক্ষ্যণীয় তাবুগুলিতে কেবল মহিলা ও শিশুরা থাকত; পুরুষরা তাদের পাহাড়া দিত।

 4. মৌলিক পোশাক: 

আবহাওয়া এবং পরিবেশগত অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য প্রাণীর চামড়া বা উদ্ভিদের ছাল থেকে পোশাক তৈরি করা হয়েছিল।

 5. পাথরের সরঞ্জাম: 

তারা পাথর, কাঠ, হাড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে মৌলিক সরঞ্জাম তৈরি করেছে। এই সরঞ্জামগুলি শিকার, খাদ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য বিভিন্ন কাজের জন্য অপরিহার্য ছিল।

 6. আগুন নিয়ন্ত্রণ: 

প্রাক-ঐতিহাসিক মানুষ আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল। আদিম মানুষ প্রথম আগুন পেয়েছিল জঙ্গলের দাবানল থেকে। তারা নিজেরে আগুন জ্বালাতে পারত না। তাই তারা দাবানল থেকে পাওয়া আগুনকে কখনও নিভে যেতে দিক না। এর জন্য দলের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব ছিল আগুনকে জ্বালিয়ে রাখা। কারন আগুন তাদের উষ্ণতা, আলো এবং শিকারীদের (বন্য পশু) থেকে সুরক্ষা প্রদান করত। খাবার রান্নার (ঝলসে) জন্যও আগুন ব্যবহার করা হত। কারন কাঁচা খাবার সহজে হজম হত না। আগুনে পুরিয়ে (ঝলসে) খাওয়ার ফলে হজম ক্ষমতা এবং পুষ্টির মান উন্নত হয়েছিল।

 7. সামাজিক কাঠামো: 

তাদের সমাজ ছিল ছোট এবং আত্মীয়-ভিত্তিক। যেহেতু তারা যাযাবর জীবন যাপন করত তাই তাদের দল গুলি বেশি বড় হত না। কারন তাতে খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। যতদিন না পর্যন্ত তারা কৃষিকাজ শিখল তারা জঙ্গলে দলবদ্ধ ভাবে জাবনযাপন করত। যা তাদের খাদ্য সংগ্রহ ও বন্য পশুদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সাহায্য করত। তারা একটা সম্প্রদায়ের একটি শক্তিশালী অনুভূতি এবং বেঁচে থাকার জন্য সহযোগিতা উপলব্ধি করেছিল।

 8. মৌখিক ঐতিহ্য: 

যোগাযোগ মৌখিক ঐতিহ্যের উপর অনেক বেশি নির্ভর করে। কারন যেহেতু সেই সময় মানুষ মুখের ভাষার ব্যবহার শেখেনি তাই তারা ইশারার সাহায্যে ভাব বিনিময় করত। তাদের জ্ঞান, গল্প এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনগুলি গল্প বলার এবং মৌখিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে প্রজন্মের মধ্যে চলতে থাকে। এরপর তারা ছবি আঁকতে শেখে এবং ছবির মাধ্যমে শিকারের কৌশল আয়ত করে। 

9. শিল্প এবং আচার-অনুষ্ঠান: 

প্রাক-ঐতিহাসিক লোকেরা শৈল্পিক অভিব্যক্তির প্রাথমিক রূপগুলি প্রদর্শন করেছিল। এগুলি হল গুহাচিত্র, খোদাই এবং বেশকিছু ভাস্কর্য। কবর অনুশীলন এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সম্পর্কিত আচারগুলিও তাদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির অংশ ছিল।

 10. অভিযোজনযোগ্যতা: 

বিভিন্ন পরিবেশ এবং জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের বন ও সমভূমি থেকে মরুভূমি এবং পাহাড়ী ভূখণ্ড পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করতে সাহায্য করেছিল। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা এক স্থান থেকে‌ অন্য স্থানে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

 11. সীমিত বস্তুগত সম্পদ: 

তাদের যাযাবর জীবনধারার কারণে, সম্পত্তি ছিল ন্যূনতম, এবং বস্তুগুলি মূলত উপযোগী প্রকৃতির ছিল। যেমন পাথর ও কাঠের তৈরি নানা ব্যবহার্য বস্তু।

 12. জীবন প্রত্যাশা: 

আধুনিক সময়ের তুলনায় তাদের আয়ু অপেক্ষাকৃত কম ছিল। তাদের গড় আয়ু ছিল প্রায় 30 থেকে 40 বছর (অনুমান করা হয়)। কারন 

  • ১। বনে জঙ্গলে খাদ্যের অভাবে অনেকে মারা যেত,
  • ২। বন্য পশুর আক্রমণে অনেকে মারা যেত,
  • ৩। নানা রোগে অনেকে মারা যেত, ইত্যাদি।

 প্রাক-ইতিহাসের লোকেরা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস করত। তাদের জীবন জটিলভাবে পরিবেশের ছন্দে বোনা ছিল। তাদের জীবনধারা বেঁচে থাকা, সম্পদশালীতা এবং প্রাকৃতিক জগতের সাথে তাদের সংযোগের দ্বারা তৈরি হয়েছিল।

Related Short Question:

প্রশ্নঃ প্রাক-ইতিহাসের মানুষ কারা ছিলেন?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাস মানুষ ছিল প্রাথমিক মানব পূর্বপুরুষ যারা লেখার উদ্ভাবনের আগে বেঁচে ছিলেন।

 প্রশ্ন: প্রাক-ইতিহাস মানুষের জীবনধারা কেমন ছিল?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাস মানুষ শিকারী-সংগ্রাহক যাযাবর হিসাবে বাস করত, খাদ্য উত্স অনুসরণ করতে এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভর করার জন্য ছোট দলে চলেছিল।

 প্রশ্ন: প্রাক-ইতিহাস মানুষ কীভাবে খাদ্য পেতেন?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাসের লোকেরা বন্য প্রাণী শিকার করে এবং ভোজ্য গাছপালা, ফল, বাদাম এবং শিকড় সংগ্রহের মাধ্যমে খাদ্য অর্জন করেছিল।

 প্রশ্ন: তারা আশ্রয়ের জন্য কি উপকরণ ব্যবহার করেছিল?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাসের লোকেরা গুহা এবং কুঁড়েঘরের মতো অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করতে পশুর চামড়া, শাখা, পাতা এবং পাথরের মতো উপকরণ ব্যবহার করত।

 প্রশ্ন: তারা কীভাবে যোগাযোগ করেছিল?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাসের লোকেরা সম্ভবত অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বর এবং ভাষার প্রাথমিক রূপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিল।

 প্রশ্ন: তারা কি সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাসের লোকেরা শিকার এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য পাথর, কাঠ, হাড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে তৈরি মৌলিক সরঞ্জাম ব্যবহার করত।

 প্রশ্ন: আগুন তাদের জীবনে কী ভূমিকা পালন করেছিল?

 উত্তর: আগুন তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, উষ্ণতা, আলো, সুরক্ষা প্রদান করে এবং খাদ্য তৈরিতে সহায়তা করে।

 প্রশ্ন: তারা কীভাবে তাদের সংস্কৃতি প্রকাশ করেছিল?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাসের লোকেরা তাদের সংস্কৃতিকে প্রকাশ করেছিল গুহাচিত্র, খোদাই এবং ভাস্কর্যের মাধ্যমে, যা তাদের শিল্প ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রাথমিক রূপকে প্রতিফলিত করে।

 প্রশ্নঃ সমাজ কাঠামো কেমন ছিল?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাস সমাজগুলি ছোট এবং আত্মীয়-ভিত্তিক ছিল, বেঁচে থাকার জন্য সম্প্রদায় এবং সহযোগিতার উপর জোর দেয়।

 প্রশ্নঃ প্রাক-ইতিহাস কবে শেষ হয়?

 উত্তর: প্রাক-ইতিহাস লেখার আবির্ভাবের সাথে শেষ হয়েছিল, যা নথিভুক্ত ইতিহাসে রূপান্তরকে চিহ্নিত করে, সাধারণত প্রায় 5,000 থেকে 6,000 বছর আগে।

Next Post Previous Post